• চাহিদা তলানিতে, তবু জাবেদা খাতা নিয়ে বিহার থেকে এরাজ্যে আসেন মহম্মদ আবিদ
    বর্তমান | ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • ব্রতীন দাস, জলপাইগুড়ি: পাড়ার মুদি দোকানেও এখন ধার-বাকি প্রায় উঠে গিয়েছে। নগদের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে আবার জায়গা করে নিয়েছে ডিজিটাল লেনদেন। ফলে চাহিদা কমেছে জাবেদা খাতার। তবুও ওই খাতা বিক্রির আশায় বিহার থেকে ফি বছর জলপাইগুড়িতে আসেন আবিদ হোসেন। এবারও এসেছেন। সারাবছর যোগাযোগ না থাকলেও ফি বছর রামনবমীর আগে তিস্তাপাড়ের শহরে চলে আসেন বিহারের দ্বারভাঙার বাসিন্দা বছর পঁয়ষট্টির আবিদ। দিনবাজারে ঢোকার মুখে জলপাইগুড়ির মার্চেন্ট রোডে ফুটপাতে লাল কাপড়ে মোড়া খাতার বান্ডিলে সাজিয়ে বসান দোকান। এবছরও তার অন্যথা হয়নি। কিন্তু নববর্ষে জাবেদা খাতার চাহিদা এতটাই কমে গিয়েছে যে, পেট চালানোই দায়, প্লাস্টিকের ভাঙা টুলে বসে বলছিলেন আবিদ। গলায় আক্ষেপের সুর। বললেন, প্রতিবারই ভাবি আর আসব না। কিন্তু গত ৪২ বছর ধরে জলপাইগুড়িতে আসছি। বাবার সঙ্গে প্রথমবার এই শহরে পা রেখেছিলাম। অনেকগুলো বছর হয়ে গেল। তাই জলপাইগুড়িতে আসব না ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়। তাছাড়া জাবেদা খাতা তৈরি তো আমাদের পারিবারিক ব্যবসা। এটা ছেড়ে এই বয়সে অন্য কী কাজ করব! পেট চলবে কীভাবে! 

    আবিদ হোসেনরা ছয় ভাই। তিন ভাই জাবেদা খাতার ব্যবসার সঙ্গে থাকলেন, বাকি তিনজন অন্য কাজ করেন। প্রথমদিকে নববর্ষের প্রাক্কালে বাবার সঙ্গে তাঁরা তিন ভাই মিলে জাবেদা খাতা নিয়ে জলপাইগুড়িতে আসতেন। কিন্তু এখানে ব্যবসা জমাতে না পেরে বেশকিছু বছর হল ওই ভাইয়েরা আর আসেন না। তাঁরা বিহারে জাবেদা খাতার ব্যবসা করেন। কিন্তু জল-শহরের টান ছাড়তে পারেননি আবিদ। 

    ত্রিশ টাকা থেকে পাঁচশো টাকার জাবেদা খাতা রয়েছে আবিদের দোকানে। কোনো খাতার উপর লক্ষ্মী-গণেশের ছবি। কোনোটির উপর লেখা ‘শুভ লাখ’। আগে বিক্রিবাটা ভালো থাকায় দোকান সামলানোর জন্য স্ত্রী মামুদা, ছেলে আকসাদ আলিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন জলপাইগুড়িতে। কিছু খাতা তৈরি করে নিয়ে আসতেন। বাকিটা অর্ডার মতো জলপাইগুড়িতে এসে বানিয়ে দিতেন। মাস খানেকের বিক্রিবাটায় ভালোই লক্ষ্মীলাভ হতো। কিন্তু এখন বদলে গিয়েছে ছবিটা। সারাদিন অপেক্ষার পর হাতেগোনা দু-একটা খাতা বিক্রি হয়। তা দিয়ে জলপাইগুড়িতে থাকা-খাওয়ার খরচ ওঠে না। বললেন আবিদ। 

    ওই বৃদ্ধের কথায়, ছেলে বিহারে এসি মেকানিকের কাজ করে। আমার শরীর ভালো না থাকায় এবার জোর করে ভাইপোকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। এই বয়সে আর কী করব! তাই বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকে শেখা জাবেদা খাতা তৈরি করেই কোনোমতে পেট চালাচ্ছি। 

    সারাদিন দোকান সামলে ১০০ টাকা দৈনিক ভাড়ায় আবিদের রাত কাটে দিনবাজারে একটি ধর্মশালায়। তবে বিক্রিবাটা যাই হোক না কেন, জলপাইগুড়ির শান্ত পরিবেশ মুগ্ধ করে আবিদকে। বললেন, এত বছর ধরে ব্যবসার সূত্রে আসছি জলপাইগুড়িতে। শহরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আপদে-বিপদে তাঁদের সহযোগিতা পেয়েছি। ভিনরাজ্যের হওয়া সত্ত্বেও এখানকার মানুষ আমার সঙ্গে ‘আপনজনের’ মতোই ব্যবহার করেন। তবে তাঁর আক্ষেপ, আগে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা আমার কাছে জাবেদা খাতা কিনতে আসতেন। এখন শুধুমাত্র নববর্ষের পুজোর জন্য কেউ নাম কা ওয়াস্তে একটা খাতা নেন। ফলে বেশিরভাগটাই দোকানে পড়ে থাকে। • নিজস্ব চিত্র।
  • Link to this news (বর্তমান)