সৌম্য দে সরকার, মালদহ: বাঙালির নববর্ষ মানে নতুন বছরকে হইহই করে বরণ করা। ভূরিভোজের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন শুরু। হিসাবের নতুন খাতা। বকেয়া পরিশোধ করে নতুন লেনদেনের আরম্ভ। আগে এই বকেয়া মিটিয়ে নতুন বাণিজ্য শুরুর সবটাই হতো খাতায় লিখে। হালখাতা বাংলা নববর্ষের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সিঁদুর বা আলতা দিয়ে বাণিজ্যিক হিসাবের নতুন খাতায় স্বস্তিকা চিহ্ন এঁকে শ্রীশ্রী গণেশায় নমঃ লিখে শুরু নতুন বছরের হিসাবের। সময়ের সঙ্গে পালটে গিয়েছে হালখাতার ধরনও।
এখন অনেকেই ঝুঁকেছেন স্মার্টফোনে ডাউনলোড করা ব্যবসায়িক হিসাব রাখার অ্যাপে। বকেয়ার হিসাব হোয়াটসঅ্যাপে ক্রেতাদের পাঠিয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতারাও বিভিন্ন পেমেন্ট অ্যাপের মাধ্যমে পরিশোধ করছেন বকেয়া। নববর্ষে ক্রেতাদের বাড়িতে পরিসেবা প্রদানকারী সংস্থার মাধ্যমে বিক্রেতাদের তরফ থেকে পৌঁছে যাচ্ছে মিষ্টির প্যাকেট সহ উপহার।
প্রায় কোণঠাসা নববর্ষে হালখাতা উদযাপনের সাবেকি রীতি। দীর্ঘ দগ্ধদিনের অপরাহ্ন বা সন্ধ্যায় ঘামে ভিজেও সপরিবারে বিভিন্ন দোকানে গিয়ে পাওনা মিটিয়ে কোল্ড ড্রিংকসে চুমুক দেওয়ার দৃশ্য এখন অনেকটাই উধাও। যেমন অদৃশ্য নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার এবং মিষ্টি ও নিমকির প্যাকেট বগলদাবা করে খোশমেজাজে বাড়ি ফেরার চিরাচরিত ছবিও।
তবে, সবাই যে এই অত্যাধুনিক হালখাতার গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসছেন তেমনও নয়। অনেক বিক্রেতা থেকে ক্রেতা এখনও সাবেকি রীতিতেই হালখাতা উদযাপনের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রেখেছেন।
মালদহ শহরের ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ব্যবসায়ী বিকাশ সাহা বলেন, এখন অনেক ব্যবসায়ীই ডিজিটাল হিসাব খাতা ব্যবহার করেন। ক্রেতারা বিভিন্ন পেমেন্ট অ্যাপের মাধ্যমে টাকা দেন। বাকির হিসাব খাতায় লিখতে গেলে অনেক সময় ভুলচুক হয়ে যায়। সব হিসাব খাতায় তোলার কথা মনেও থাকে না। তাই এই অ্যাপগুলিতে হিসাব রাখা সুবিধাজনক। কত টাকা বাকি রইল, তার হিসাব ক্রেতাদের মোবাইলে পৌঁছে যায় সঙ্গে সঙ্গে। ফলে দুই পক্ষের কাছেই স্বচ্ছ হিসাব থাকে।
অনেক ক্রেতা হালখাতার দিন ব্যস্ততার কারণে দোকানে আসতে পারেন না। তাই একটি প্রখ্যাত মিষ্টির দোকানে অর্ডার পাঠিয়ে ক্রেতাদের বাড়ির ঠিকানায় হোম ডেলিভারি করে দিতে বলেছেন বিকাশ। সঙ্গে ক্রেতাদের মোবাইলে পাঠিয়ে দিচ্ছেন নতুন বছরের বাংলা ক্যালেন্ডার।
মালদহ শহরের কেজে সান্যাল রোডে ফাস্টফুডের স্টার্ট আপ চালু করেছেন শান্তনু রায় এবং তাঁর স্ত্রী নন্দিনী রায়। তরুণ এই দম্পতি জানালেন, তাঁদেরও প্রথম পছন্দ ডিজিটাল হিসাব রক্ষা এবং লেনদেন। নববর্ষে নিয়মিত ক্রেতাদের হোয়াটসঅ্যাপে একটি বিশেষ কোড পাঠাচ্ছেন তাঁরা। দু’সপ্তাহের মধ্যে ওই কোড দেখালেন এক প্লেট চিকেন মোমো ফ্রি দেবেন তাঁদের।
এমন আধুনিক দৃশ্যের উলটোদিকে রয়েছে সাবেকি হালখাতার ছবিও। পরিচিত হেলথ ড্রিঙ্কস সহ বেশ কিছু পণ্যের ডিস্ট্রিবিউটর অঞ্জনকৃষ্ণ পাল বলেন, আমরা এখনও হালখাতার সাবেকি রীতিই ধরে রেখেছি। নিয়ম করে ক্রেতাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়ে ফোন করে হালখাতায় আসার অনুরোধ করি। এমনই কিছু মুহূর্তে পরিচিত ক্রেতাদের সঙ্গে দেখা হয়। মজবুত হয় সম্পর্ক।
নববর্ষে দোকানে গিয়েই হালখাতা করার মধ্যে এক বিশেষ উষ্ণতা রয়েছে বলে জানালেন ৪০ ছুঁইছুঁই গৃহবধূ মোনালিসা সেনগুপ্ত। বলেন, শৈশব, কৈশোরে বাবা মায়ের সঙ্গে দোকানে দোকানে গিয়ে মিষ্টি, নিমকি, নরম পানীয়ের ঠাণ্ডা বোতলে চুমুক দেওয়ার স্মৃতি অমলিন। বাড়তি পাওনা নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার। তাই নিয়ম করে মুদিখানার দোকানে গিয়ে বকেয়া পরিশোধ করে মিষ্টি, নিমকি খেয়ে আজও বাড়ি আসি নতুন বাংলা ক্যালেন্ডার হাতে।