• অনলাইন মার্কেটিংয়ের যুগে বিপন্ন হালখাতা
    বর্তমান | ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • সঞ্জিত সেনগুপ্ত, শিলিগুড়ি: অনলাইন মার্কেটিং। ঘরে বসেই পাওয়া যায় আলপিন থেকে সেফটিপিন। দোকানে গিয়ে জিনিস কেনার  পর মোবাইল পে থেকে  দাম মোটানো হচ্ছে। প্রযুক্তির এই থাবায় বদলে গিয়েছে হালখাতার চরিত্র। পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে সিদ্ধিদাতা গণেশের পুজো দিয়ে ব্যবসায়ীদের নতুন বছরের নতুন খাতা খোলার রেওয়াজ আজও আছে। কিন্তু সেই জমজমাট উৎসব, ক্রেতা-বিক্রেতার আন্তরিক মেলবন্ধন হারিয়ে গিয়েছে। 

    উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে এখন গোটা ব্যবসার  হিসেব তোলা থাকছে  কম্পিউটার, ল্যাপটপে। খাতার কদর নেই বললেই চলে। আর একারণেই হালখাতার খাতা বিক্রেতারা পড়েছেন সংকটে। খাতা এখনও বিক্রি হয়। তবে সবটাই নিয়ম রক্ষার্থে। তাই একটা ছোট খাতা কিনে তা পুজো দিয়ে নিয়ম রক্ষা করছেন ব্যবসায়ীরা। শিলিগুড়ি রেলগেটের কাছে গত ৩৪ বছর ধরে এই খাতার ব্যবসা করে আসছেন মহম্মদ আনোয়ার। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে  বলেন, এখন ব্যবসায়ীরা খাতা কিনতে আসেন ঠিকই। তবে একটা খাতা কিনে নিয়ম রক্ষা করেন। আগের মতো লাভ আর এই ব্যবসায় নেই। তাই সামান্য কয়েকটি খাতা বিক্রি করে সংসার চলে না। তবু অন্য ব্যবসার সঙ্গে এই পৈত্রিক ব্যবসা ধরে রেখেছি।

    পাশের দোকানের মহম্মদ আসাদেরও একই বক্তব্যও একই। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে এই চত্বরে বাংলা নববর্ষের হালখাতা বিক্রি করে আসছেন। তিনি বলেন, আগে প্রতিটি দোকানদার কমপক্ষে সাতটি করে খাতা কিনতেন। একটা বাকির খাতা, একটা নগদের হিসেব রাখার খাতা, এরকম ভাগে ভাগে বাকি সব খাতা ব্যবহার করতেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হয়ে যাওয়ার পরে এখন ব্যবসায়ীরা আর এত খাতা রাখার ঝামেলা পোহাতে চান না। তাই তাঁরা এখন নিয়মের একটি খাতা কিনে চলে যান।  বর্তমানে একটি খাতার দাম ৮০-১০০ টাকা। অথচ এক সময় আমরা এই পয়লা বৈশাখে এই দিনটির দিকেই তাকিয়ে থাকতাম মোটা টাকা উপার্জনের জন্য। 

    কম্পিউটার নির্ভরতার কারণে এখন খাতা বিক্রেতারা যেমন সঙ্কটের মধ্যে এসে পড়েছেন সেরকম পুরোহিতদেরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে।  আগের মতো আর দোকানে দোকানে সেভাবে পুজো হচ্ছে না। এখন বহু ব্যবসায়ী কালীবাড়িতে ডালা সাজিয়ে চলে যান। কালীবাড়ি থেকে পুজো করে এসে দোকানে সিদ্ধিদাতা গণেশের মূর্তি বসিয়ে তাঁরা কালীবাড়ি থেকে পুজো দেওয়া ফুল-বেলপাতা আসনে রেখে নববর্ষের পুজো সারছেন। 

    শহরের প্রবীণ পুরোহিত রবীন ঘোষাল বলেন, কয়েক বছর আগেও পয়লা বৈশাখের দিন কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫টি দোকানে পুজো করতে হতো। ভালো টাকা উপার্জন হতো  দক্ষিণাবাবদ। সেইসঙ্গে অন্যান্য সামগ্রী তো ছিলই।  কিন্তু এখন একটা পুজো জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।  বহু ব্যবসায়ী এখন আর দোকানে পুজো করে ঝামেলা বাড়াতে চাইছেন না। প্রত্যেকেই কালীবাড়িতে পুজো দিচ্ছেন। 

    গালামাল ব্যবসায়ী সুব্রত সাহা, আনন্দ পালরা বলেন, কম্পিউটার, মোবাইল অ্যাপ ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে হিসেব রাখা হয়। প্রায় সকলেই এখন অনলাইন পেমেন্ট ও তাৎক্ষণিক লেনদেনে জিনিস কিনছেন।  ফলে বাকি বা দেনা থাকে না বললেই চলে। বড় বড়  দোকানগুলি ডিসকাউন্ট, অফার বা গিফট দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণ করে। হালখাতার জৌলুস হারানোর এটি অন্যতম কারণ।

    আর তাতে সংকটে পড়েছেন, হালখাতার খাতা বিক্রেতা ও পুরোহিতরা। তাই আক্ষেপের সঙ্গেই তাঁরা বলছেন, এমন পয়লা বৈশাখ তো আমরা চাইনি। সেকালে হালখাতা ছিল এক সামাজিক ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব, আর এখন তা অনেকটাই আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গিয়েছে। নিয়ম রক্ষার মধ্যদিয়ে হালখাতার  মূল চেতনা, নতুন সূচনা ও সম্পর্কের বন্ধন লড়াই করে টিকে আছে।
  • Link to this news (বর্তমান)