• ডিজিটাল যুগে কি হারিয়ে যেতে বসেছে হালখাতার আন্তরিকতা
    বর্তমান | ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • সুকমল দালাল, বোলপুর: নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাঙালির আবেগ বহুমাত্রিক। তবে হালে শহরাঞ্চলে নববর্ষ উদ্‌যাপন ঘিরে যে চাকচিক্য এসেছে, আট বা নয়ের দশকে তত আড়ম্বর ছিল না। সেসময় মফস্বলে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন ছিল একেবারেই সাদামাটা। শপিংমলের দাপট ছিল না। মফস্বলে গুটিকয়েক জামাকাপড়, স্টেশনারি, আসবাবপত্র ও মুদিখানার দোকান, মাছের আড়তে এই দিনটি উদ্‌যাপিত হত। এখন বড়ো বড়ো শপিংমল, অফার, অনুষ্ঠান ও বিরিয়ানির প্যাকেটে আগের সেই আন্তরিকতাটাই হারিয়ে যাচ্ছে-এমনটাই মনে করছেন প্রবীণদের অনেকে।

    হালখাতার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বহু আগে চৈত্র মাসের শেষে চাষিরা জমিদারদের খাজনা পরিশোধ করতেন। সেদিন জমিদারের বাড়িতে পাত পেড়ে খাওয়ানোর প্রথাও ছিল। চাষিরা নতুন পোশাক পরে জমিদারবাড়িতে উপস্থিত হতেন। জমিদারি প্রথার পতনের পর ব্যবসায়ীদের হালখাতা ঘিরে এই উৎসব আবর্তিত হতে থাকে। ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের ধারে জিনিসপত্র দিতেন। বছরের শেষে সমস্ত ধার চুকিয়ে নতুন বছরের জন্য নয়া খাতা খোলা হত। এই প্রথাই হালখাতা।

    ছোটোবেলায় বাবার হাত ধরে হালখাতা করতে গিয়ে ক্যালেন্ডার আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ফেরার স্মৃতি এখনও অনেকের মনে উজ্জ্বল। বাড়িতে ফিরেই সেই মিষ্টি খেতে বসে যেত খুদেরা। কার মিষ্টি বেশি, তা নিয়ে চলত চর্চাও। বছরের একটা দিনে ক্রেতাদের আপ্যায়নে দোকানদাররাও ক্রটি রাখতেন না। অনেকসময় পহেলা বৈশাখ বিশেষ ছাড়ও দেওয়া হত, বিশেষত গয়নার দোকানে।

    নববর্ষের সকালে ব্যবসায়ীরা লাল শালুতে মোড়া নতুন খাতা নিয়ে বীরভূমের তারাপীঠ বা কঙ্কালীতলায় পুজো দিতে যান। অনেকেই ব্যবসার উন্নতির আশায় মন্দিরে পুজো দেন। আবার কেউ দোকানেই সিঁদুরে ডোবানো কয়েনের ছাপ দিয়ে গণেশ ও লক্ষ্মীকে স্মরণ করেন।

    তবে সময়ের সঙ্গে হালখাতার চেহারা বদলেছে। বীরভূমের বোলপুর, সিউড়ি, সাঁইথিয়া বা মহম্মদবাজারের মতো জায়গায় ছোটো ছোটো দোকানে হালখাতার ছবি আর তেমন দেখা যায় না। তার জায়গা নিয়েছে বড়ো বড়ো শপিংমল। যেখানে নববর্ষে নানা ছাড় দেওয়া হয়। ক্যালেন্ডার ও মিষ্টির জায়গায় এসেছে বিরিয়ানির প্যাকেট।

    এটা যেমন একটা দিক, তেমনি এর অন্য একটা দিকও আছে। অনেক ব্যবসায়ীই মনে করেন, এখন ক্রেতাদের মধ্যে দেখনদারির প্রবণতা বেড়েছে। নববর্ষের দিনে চেনা দোকানে হালখাতা করে শুভেচ্ছা বিনিময় কমে এসেছে। বরং ওইদিন শপিং সেরে রেস্তরাঁয় পরিবার নিয়ে খাওয়াদাওয়া করছেন অনেকে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতদের মধ্যে যে আন্তরিক যোগাযোগ, তা কমে এসেছে।

    অনলাইন বাজারও এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। নানা অফার, সেল, ‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’-এসবের জেরে দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনাও কমে গিয়েছে। আধুনিকতার এই ঢেউয়ে টিকে থাকার লড়াই করছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ নিজেদের বদলাতে পারছেন। কিন্তু সবার পক্ষে তা সম্ভবও হচ্ছে না।

    তাই বাংলা নববর্ষে এই প্রশ্নটাই বড়ো হয়ে দেখা দিচ্ছে, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে আন্তরিক ও মধুর সম্পর্ক গড়ে যে হালখাতার সংস্কৃতি, তা কি ডিজিটাল যুগে ম্লান হয়ে যাচ্ছে? ব্যবসায়ী ও ক্রেতার মধ্যে সম্পর্কে সৌহার্দ্যের জায়গাটা কি দখল করছে নিছক লেনদেন? পহেলা বৈশাখে এপ্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।
  • Link to this news (বর্তমান)