• নববর্ষ বাঙালির আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ
    বর্তমান | ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • কল্লোল প্রামাণিক, করিমপুর: চলে এল আর একটি বাংলা নববর্ষ। এই বাংলা নববর্ষ বর্তমানে শুধু একটি পঞ্জিকার পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এই নববর্ষ এখন বাঙালির আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময়ের বিবর্তনে এই উৎসবের ধরণ ও উদযাপনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ​তবুও বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে যে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সনের প্রচলন হয়েছিল। আজ তা বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। তবে সময়ের সাথে সাথে এই উৎসবের  আড়ম্বর ও উদযাপনে আমূল পরিবর্তন এসেছে।

    সেকালে নববর্ষের মূল ভিত্তি ছিল গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি। তখন এই দিনটি ছিল মূলত ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ বা নতুন খাতা খোলার দিন। লাল শালুতে বাঁধানো খাতায় নতুন বছরের হিসেব শুরু হত। .ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হতো। আবার জমিদার বাড়িতে প্রজাদের আগমন এবং খাজনা আদায়ের এক আনুষ্ঠানিক দিন ছিল। গ্রামে গ্রামে বসত বৈশাখী মেলা। সেখানে মাটির পুতুল, বাঁশি, নাগরদোলা আর মুড়ি-মুড়কির মিলত। কুস্তি, লাঠিখেলা এবং নৌকাবাইচ ছিল সেকালের নববর্ষের প্রধান আকর্ষণ। উৎসবে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। ছিল আন্তরিকতা।

    বর্তমানে নববর্ষের আমেজ গ্রাম ছাড়িয়ে শহরে বিশাল আকার ধারণ করেছে। এখন এই দিনটি  কেবল ব্যবসায়িক উৎসব নয়, বরং বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতীক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কো স্বীকৃত এক বিশ্ব ঐতিহ্য। পাপেট, মুখোশ আর রঙিন ফেস্টুনে অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা করা হয়। একালের নববর্ষে ‘পান্তা-ইলিশ’  একটি জনপ্রিয় ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যদিও এর প্রাচীনতা নিয়ে বিতর্ক আছে। লাল-সাদা শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে উৎসবে শামিল হওয়া এখনকার প্রজন্মের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখন মানুষ সশরীরে দেখা করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

    সেকালে নববর্ষ ছিল সাদামাটা ও ঘরোয়া। একালের নববর্ষ অনেক বেশি জাঁকজমকপূর্ণ ও করপোরেট সংস্কৃতির ছোঁয়াযুক্ত। তবে আয়োজনের ধরণ পাল্টালেও উৎসবের মূল সুরটি কিন্তু একই আছে। তা হলো পুরোনো গ্লানি মুছে নতুনকে বরণ করে নেওয়া। সেকালের সেই মেঠো সুর আর একালের নাগরিক কোলাহল এই দুই মিলে নববর্ষ বাঙালির ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। উৎসবের ধরণ যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন পহেলা বৈশাখ চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে তার অসাম্প্রদায়িক এবং নিজস্ব অস্তিত্বের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে। 
  • Link to this news (বর্তমান)