• শহরের রাস্তায় আখ নিংড়ে রস বিক্রি করেই সংসারের জোয়াল টানেন গীতা
    বর্তমান | ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • সুকান্ত বসু, কলকাতা: স্বামী মারা গিয়েছেন ১৫ বছর আগে। অভাব‑অনটনের সংসার। সেই ঘানি টানতে শহরের অলিগলিতে প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে আখের রস বিক্রি করেন গীতা সর্দার। চাকা ঘুরিয়ে আখ নিংড়ে রস বের করা কম কষ্টের কাজ নয়। গায়ে জোর লাগে রীতিমতো। শেষমেশ রস ভরতি কাচের গ্লাস হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে ক্রেতাদের কাছে। কেউ ওই রসের প্রশংসা করলে চিকচিক করে ওঠে গীতার মুখ। তিনি বলেন, আপনারাই আমার লক্ষ্মী।

    পঞ্চাশের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো গীতাদেবী আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘সংসারের জোয়াল টানতে টানতে জীবনটা কেমন আখের ছিবড়ের মতো হয়ে গিয়েছে।’ শহরের মানুষ যখন নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন গীতাদেবী কলকাতার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে চিৎকার করে হাঁক দেন— ‘বাবুগো ভালো আখের রস আছে, খেয়ে যান...’। কোলাহল মুখর শহরে তাঁর এই আর্তির মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে যন্ত্রণার সুর।

    শ্যামবাজার ছাড়িয়ে যে রাস্তা রাজা মণীন্দ্র কলেজের দিকে গিয়েছে, সেই ভূপেন বোস অ্যা঩ভিনিউয়ে কথা হচ্ছিল গীতাদেবীর সঙ্গে। আখ পেষাই করতে করতে গীতাদেবী বলেন, ‘রোজ ভোর ৪টের সময় ঘুম থেকে উঠতে হয়। কোনোভাবে রান্না সেরে স্নানে যাই। এরপর চা খেয়েই আখ পেষা‌ই঩য়ের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। যেদিন শরীর সায় দেয় না, সেদিন ঘরে আর রান্না করি না। ফুটপাতেই ভাত খেয়েনি। প্রতিদিনের খরচ বাদ দিয়ে যেটুকু আয় হয়, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলে যায়। কোনো কোনো দিন বিক্রিবাটা খারাপ হলে মাথায় হাত পড়ে। তখন ছাড়ানো আখ হয় কম দামে বেচে দিতে হয়, নাহয় বিলি করে দিতে হয়।’

    কথা প্রসঙ্গে গীতাদেবী বলেন, ‘দু-একদিন অন্তর পাইকারি বাজারে গিয়ে আখ কিনে আনি। আগে নিজেই ছুরি দিয়ে আখের ছাল ছাড়াতাম। তা করতে গিয়ে হাত ফালাফালা হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে কাটা জায়গায় এত যন্ত্রণা হত যে, কাজই করতে পারতাম না। এখন একজনকে রেখেছি, সে ছুলে দেওয়ার কাজ করে।’ কথা প্রসঙ্গে একরাশ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বামী অকালে চলে গেল। ওর শরীরে নানা অসুখ বাসা বেঁধেছিল। ঠিকা শ্রমিকের কাজ করত তো! টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসাই করাতে পারিনি। স্বামী মারা যাওয়ার পর কিছুদিন আমি জোগাড়ের কাজ করতাম। কোনো দিন কাজ পেতাম, আবার কোনোদিন পেতাম না। এমনকি, এমনও দিন গিয়েছে, যেদিন কাজ করলেও পুরো টাকা পাইনি। শেষ পর্যন্ত সংসার বাঁচাতে বাধ্য হয়ে আখের রস বিক্রি করতে নেমেছি। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কতদিন এই কাজ করতে পারি।’  নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)