সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়
অশান্তির আশঙ্কার নিরিখে রাজ্যে বেশ কয়েক হাজার স্পর্শকাতর বুথ চিহ্নিত হয়েছে আগেই। এ বার আর্থিক ভাবে সংবেদনশীল (এক্সপেনডিচার সেনসিটিভ) হিসেবে রাজ্যের ৫৫টি বিধানসভাকে চিহ্নিত করল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাদেরই নির্দেশে পুলিশ, আয়কর, আবগারি ও শুল্ক দপ্তর, ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই), ইডি এবং রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক বাছাইয়ের কাজটি করেছে। উল্লেখযোগ্য যে, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায়ের বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরের বেশ কিছু বুথ আইনশৃঙ্খলার নিরিখে অতিস্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করার সঙ্গেই গোটা বিধানসভা এলাকাকে 'আর্থিক ভাবে সংবেদনশীল' তকমা দিয়েছে ইসি।
কলকাতার পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনায় নজর রয়েছে কমিশনের হয়ে সক্রিয় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির। ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে এই জেলার আটটি বিধানসভা কেন্দ্র আর্থিক ভাবে সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই তালিকায় আছে বিধাননগর, রাজারহাট-নিউটাউন, দমদম, বারাসত, মধ্যমগ্রাম, ভাটপাড়া, গাইঘাটা ও বনগাঁ উত্তর। নজরে আছে বসিরহাটও।
উত্তর কলকাতার সাত বিধানসভা এলাকার মধ্যে চারটি এবং দক্ষিণ কলকাতার চার বিধানসভার মধ্যে তিনটিকেই পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি এজেন্সিগুলি আর্থিক ভাবে সংবেদনশীল বলে মনে করছে। এই কেন্দ্রগুলি হলো চৌরঙ্গী, এন্টালি, জোড়াসাঁকো, মানিকতলা, ভবানীপুর, রাসবিহারী, কলকাতা বন্দর। কসবা ও টালিগঞ্জও পেয়েছে এই তকমা। হাওড়ার শহরকেন্দ্রিক তিন বিধানসভা এবং হুগলির চুঁচুড়া, সপ্তগ্রাম, সিঙ্গুর, চণ্ডীতলা আর্থিক ভাবে সংবেদনশীল তালিকায় এসেছে। উত্তরবঙ্গে আর্থিক ভাবে সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে শিলিগুড়ি।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের ভোটে বাহুবলীদের পাশাপাশি ভোট কেনাবেচায় অবৈধ অর্থ, মদ–মাদকের প্রভাব বাড়ছে। আগে এই প্রবণতা বেশি ছিল তামিলনাড়ু–সহ দক্ষিণের একাধিক রাজ্যে। তাই এ বার ইসি বঙ্গের ভোটে ১০০ জন এক্সপেনডিচার অবজ়ার্ভার পাঠিয়েছে, যা সর্বকালের রেকর্ড। এই অবজ়ার্ভারদের মূল দায়িত্ব প্রার্থীদের খরচে নজর রাখা।
পুলিশ, আয়কর, আবগারি, শুল্ক দপ্তর–সহ আরও এজেন্সিকে ভোটের সময়ে টাকা–গয়না–বেআইনি মদ–মাদকের খেলা বন্ধে সক্রিয় করা হয়েছে। আগে ভোট ঘিরে অবৈধ টাকা, মদ বিলির প্রভাব মূলত কলকাতার বড়বাজার বা আসানসোল-দুর্গাপুরে দেখা যেত। কিন্তু এই প্রবণতা রাজ্যের অন্যত্রও বাড়ছে। ইসি-কর্তারা জানাচ্ছেন, বঙ্গে ভোট ঘোষণার পরে এ পর্যন্ত শুধু দক্ষিণ কলকাতার চার বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকার বেআইনি সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে। উত্তর কলকাতার বিভিন্ন এলাকা থেকে নগদ টাকা, বেআইনি মদ, মাদক–সহ প্রায় ২৭ কোটির সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে।
ইসির সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি নগদ উদ্ধার হয়েছে হাওড়া জেলায় — অন্তত ২ কোটি ৫২ লক্ষ। এর পরেই উত্তর ২৪ পরগনা, সেখানে বাজেয়াপ্ত হয়েছে ২ কোটি ১৭ লক্ষ, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ২ কোটি ১৪ লক্ষের বেশি ইদ্ধার হয়েছে। সারা রাজ্যে উদ্ধার হয়েছে ৩৮৮ কোটি ৭ লক্ষ টাকা মূল্যের অবৈধ সামগ্রী। এ ছাড়াও আন্তঃরাজ্য সীমানা ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকায় বেআইনি মদ, মাদক ও মূল্যবান ধাতু পাচার চলে। কোচবিহার উত্তর ও কোচবিহার দক্ষিণ, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রাম, মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা, নদিয়ার পলাশিপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে নজর রয়েছে ইসির। পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুর পশ্চিম, আসানসোল উত্তর, রানিগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে আর্থিক অপরাধ বেশি হয়।
পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুর ও খড়্গপুর সদর বিধানসভা কেন্দ্রও একই কারণে আর্থিক ভাবে সংবেদনশীল। এই জেলার ডেবরা বিধানসভা কেন্দ্র মদের বেআইনি বিলির অন্যতম জায়গা বলে মনে করে পুলিশ এবং আবগারি দপ্তর। একই কারণে ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুর স্পর্শকাতর চিহ্নিত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি মদ উদ্ধার হয়েছে হুগলিতে। ১৫ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা মূল্যের বেআইনি মদ আটক হয়েছে ওই জেলায়। মাদক উদ্ধারে এগিয়ে মালদা ও মুর্শিদাবাদ। মালদায় ২৪ কোটি ৭৯ লক্ষ ৬২ হাজারের এবং মুর্শিদাবাদে মাদক মিলেছে ১৩ কোটি ২৩ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকা মূল্যের।