সুরকার উত্তমের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং আশা, তবে মহানায়কের সুরে গান গাইতে রেখেছিলেন শর্ত
২৪ ঘন্টা | ১৫ এপ্রিল ২০২৬
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাঙালির কাছে উত্তম কুমার মানেই রুপালি পর্দার এক রোমান্টিক রূপকথার রাজপুত্র। কিন্তু সেই স্টারডমের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল তাঁর আর এক অসামান্য পরিচয়— তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সুরকার এবং উচ্চাঙ্গ সংগীতে শিক্ষিত সংগীত ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৬ সালে ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবির হাত ধরে সুরকার হিসেবে উত্তমের যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন ভারতীয় সংগীতের সম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে।
ঘটনাটি ছিল বেশ নাটকীয়। উত্তম কুমার চেয়েছিলেন তাঁর সুরে গান গাওয়ান আশা ভোঁসলেকে দিয়ে। কিন্তু আশা ভোঁসলের মনে ছিল সংশয়। অভিনেতা উত্তম কুমারের ভক্ত হলেও, সুরকার উত্তম সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তাই শর্ত দিয়েছিলেন, মহানায়ককে নিজে বম্বেতে গিয়ে গান শুনিয়ে আসতে হবে। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে উত্তম হাজির হলেন আশার ড্রয়িংরুমে। কিন্তু হারমোনিয়ামে আঙুল রাখতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। উত্তমের সুরের বিস্তার আর গানের দৃশ্যায়নে তাঁর গভীর জ্ঞান দেখে মুগ্ধ আশা কেবল তাকিয়েই ছিলেন।
গান শেখানো শেষে যখন উত্তম নিজেই প্রতিটি শব্দের নিচে নিখুঁতভাবে ‘নোটেশন’ লিখে দিলেন, তখন বিস্ময়ের সীমা ছিল না বম্বের সঙ্গীত মহলের। প্রখ্যাত শিল্পী নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছাত্র এবং একসময়ের সঙ্গীত শিক্ষক উত্তম কুমারের এই শাস্ত্রীয় জ্ঞান প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, তিনি কেবল শখের সুরকার ছিলেন না। তাঁর সুরেই জন্ম নিল ‘মনের মানুষ ফিরল ঘরে’ কিংবা ‘পাতা কেটে চুল বেঁধে সে টায়রা পরেছে’-র মতো কালজয়ী গান।
কেবল আশাই নন, স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায় উত্তমের সুরের গভীরতা দেখে প্রশংসা করেছিলেন। ‘আমি যাই চলে যাই’ গানটি রেকর্ড করার পর হেমন্ত স্বীকার করেছিলেন সুরকার উত্তমের মুন্সিয়ানা। জীবনের শেষ লগ্নেও তাঁর সুরে ছিল অদ্ভুত এক বিদায়ের সুর। ১৯৮০ সালে মহানায়কের চিরবিদায়ের দিনেও বাঙালির কানে বেজেছিল তাঁরই সুর করা সেই অমোঘ গান— "যেটুকু সুরভি ছিল, হৃদয় সবই তো দিল... আমি যাই চলে যাই।"
আশা ভোঁসলে আজ অমৃতলোকের যাত্রী। উত্তম কুমার বিদায় নিয়েছেন বহু আগে। কিন্তু তাঁদের এই শৈল্পিক মেলবন্ধন আজও বাঙালির হৃদয়ে এক গভীর নস্ট্যালজিয়া হয়ে বেঁচে আছে।