সুমন ঘোষ, খড়্গপুর
তৃণমূল-সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এক সময়ে স্কুটারে ঘুরেছেন। তৃণমূল করতে গিয়ে দু'বার জেল খেটেছেন। দল ক্ষমতায় আসার পরে তাঁকে প্রার্থী না করায় অভিমানে একবার কংগ্রেসেও চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারেননি। তিন বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার (এক বার ওপেন হার্ট সার্জারি, দু'বার স্টেন্ট বসাতে হয়েছে) পরে শরীর দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির ময়দান ছাড়েননি। এ বারও কঠিন লড়াইয়ে তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সাহাকে জেতাতে দুর্বল শরীরেও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন কেশপুরের 'ডাকাবুকো' নেতা মহম্মদ রফিক।
রফিক পণ করেছেন, খুব কম করে হলেও ৭০ হাজার ভোটে প্রার্থীকে জেতাবেন। রবিবার কেশপুরের আনন্দপুরে শিউলি সাহার সমর্থনে জনসভা করতে এসেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে রফিক বলেছেন, 'কেশপুর নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। আমরা জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করছি। কমপক্ষে ৭০ হাজার ভোটে প্রার্থীকে জেতাব।' রফিকের কথায়, 'তা শোনার পরে অভিষেক বলেছেন, ভোট মিটে গেলে আমি যেন একবার তাঁর অফিসে গিয়ে দেখা করি।' ৭০ হাজার ভোটে প্রার্থীকে জেতানোর কথা শুনে হাসতে হাসতে বিজেপি নেতা অরূপ দাসের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, 'সারা বাংলা জুড়েই তৃণমূল কোমায় চলে গিয়েছে। হারের আতঙ্কে রফিক হাবিজাবি কথা বলছেন।'
রাজনীতিতে হাতেখড়ি যুব কংগ্রেসে। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির অনুগামী ছিলেন। ১৯৯৮-এ মমতা তৃণমূল দল গঠনের পরে তিনিও তৃণমূলে চলে যান। রফিকের কথায়, 'ধরে ধরে সকলকে বুঝিয়েছিলাম, প্রিয়দাকে ভালোবাসি ঠিকই, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া সিপিএমকে কেউ সরাতে পারবে না।' ১৯৯৮-এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে জেলা পরিষদের প্রার্থী হয়েও হেরে যান। সেই সময় কেশপুরের সংঘর্ষের কথা সকলেরই জানা। গুলি-বারুদের শব্দেই কাটত কেশপুরের দিবারাত্রি। মারামারি, ঘর জ্বালানো, লুটপাট ছিল প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা।
সেই সময়ে রফিক মমতাকে স্কুটারে ঘুরিয়েছিলেন কেশপুরের শোলিডিহা। তবে তিনি সবার নজর কাড়লেন ২০০০-এর লোকসভা ভোটে। কেশপুরের সরুই গ্রামে সিপিআই প্রার্থী গুরুদাশ দাশগুপ্তকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখেছিলেন। সে বার তৃণমূলের বিক্রম সরকার জয়ী হয়েছিলেন। ওই ঘটনার পরে তৃণমূলের 'স্টার ক্যাম্পেনার' হয়ে ওঠেন। দক্ষিণবঙ্গের সমস্ত জেলা, এমনকী কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনেও বক্তা হিসেবে প্রথম সারিতে থাকতেন তিনি।
২০০১ ও দু'টি বিধানসভা নির্বাচনে সিপিএমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা সুশান্ত ঘোষের বিরুদ্ধে গড়বেতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে জয়ী হতে পারেননি। তৃণমূল করতে গিয়ে একাধিক মামলায় তাঁর নাম জড়ায়। তাঁর কথায়, 'খুন, মারামারি, ঘর জ্বালানোর মতো মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়েছিল সিপিএম। তবে সবগুলোতেই জামিন পেয়ে যাই।' ২০০৬- পরপর তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাননি। দূরত্ব বেড়েছিল খোদ তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গেই।
ধীরে ধীরে 'স্পটলাইট'-এর বাইরে চলে যান। ক্ষোভে, অভিমানে কংগ্রেসেও ফিরেও গিয়েছিলেন। পরে আবার তৃণমূলে ফেরেন। ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে জেলা পরিষদের আসনে দাঁড়িয়ে জয়ী হন। তৃণমূল তাঁকে জেলা পরিষদের দলনেতা করে। দলের জন্মলগ্নে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করেও এক বারও বিধায়ক হতে পারেননি। সে অভিমান থাকলেও ৬৪ বছর বয়সে অশক্ত শরীরে প্রচারে যাচ্ছেন প্রতিদিন। বলছেন, 'কে প্রার্থী সেটা বড় কথা নয়। দলকে জেতাতে হবে। আমরা তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৈনিক।'