• গুরু নাকি শিষ্যরা? বহরমপুরে ‘ফ্যাক্টর’ অধীর, ভোটারের মন জয়ে কঠিন পরীক্ষায় পদ্ম ও জোড়াফুল প্রার্থী
    এই সময় | ১৫ এপ্রিল ২০২৬
  • শুভাশিস সৈয়দ, বহরমপুর

    বহরমপুর বিধানসভা বরাবর স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে ভালবাসে। ১৯৭৭ সাল থেকে বহরমপুর বিধানসভা আসনে পাঁচ বার কংগ্রেস এবং তিন বার RSP প্রার্থী জয়ী হন। করোনা আবহে ২০২১ সালে বিজেপি প্রার্থী সুব্রত মৈত্র প্রথম বার এই বিধানসভা থেকে জয়লাভ করেন। এ বার ছাব্বিশের ভোটের দিকে তাকিয়ে সকলে। তিন শিবিরের প্রার্থীই ভোটারের মন জয়ে কোনও কসুর রাখতে চাইছেন না। লোকসভার হার ভুলে বিধানসভায় কি কামব্যাক করবেন মুর্শিদাবাদের রবিনহুড?

    তবে এ বারের বিধানসভা ভোটে অধীর চৌধুরী প্রার্থী হওয়ায় সকলের বিশেষ নজরে বহরমপুর বিধানসভা। মূলত অধীরের কারণে বহরমপুর আসনটি রাজ্য ও ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজ্যের যে কয়েকটি আসন নজরকাড়া, তার মধ্যে অন্যতম বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্র।

    টানা পাঁচ বারের সাংসদ কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী ২০২৪ সালে পরাজিত হন। এর পরে দলের নির্দেশ মেনে এ বার বহরমপুর বিধানসভা আসনের প্রার্থী হয়েছেন। ওই বহরমপুর আসনে বিজেপি ফের প্রার্থী করেছে বিদায়ী বিধায়ক সুব্রত মৈত্র ওরফে কাঞ্চনকে আর তৃণমূলও গত বারের পরাজিত প্রার্থী তথা বহরমপুরের পুরপ্রধান নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের উপরে ভরসা রেখেছে শুধু নয় তাঁর সমর্থনে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহরমপুরে মিছিল করে জনসংযোগও করে গিয়েছেন।

    এ বার বিধানসভা ভোটে বহরমপুর আসনটি তিন প্রার্থীর কাছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই! বহরমপুরে কংগ্রেসের হারানো জমি ফেরতের পাশাপাশি জয়ী হয়ে রাজনীতির আঙিনায় নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে অধীরের। তৃণমূলের নাড়ুগোপাল এ বার পরাজিত হলে আগামী দিন বিধায়কের টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ে তিনি অনেকটাই পিছিয়ে পড়বেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল। সে ক্ষেত্রে তাঁকে বহরমপুরের পুরপ্রধান হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। অন্য দিকে, ২০২১-এ 'হাওয়ায়' জয়লাভ আসেনি, বিজেপি প্রার্থীকে এ বারের ভোটে প্রমাণ করতে হবে।

    ফলে মুর্শিদাবাদের ২২টি আসনের মধ্যে বহরমপুর আসনে চলছে 'কাঁটো কা টক্কর'। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বহরমপুরের রাজনীতির পারদ। ভোট প্রচারে বেরিয়ে স্বাভাবিক ভাবে 'টক্কর' হচ্ছে তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে। কোথাও ভোট প্রচারে 'বাধা', কোথাও আবার 'গো-ব্যাক' শ্লোগান দেওয়ার অভিযোগ শাসক দলের বিরুদ্ধে শুরুর দিকে থাকলেও ব্যুমেরাং হওয়ার আশঙ্কায় সে পথ থেকে সরে আসেন তাঁরা। কারণ অধীর চৌধুরীকে হেনস্থা বহরমপুরের মানুষ ভাল ভাবে নেননি। ওই বিষয়টি আন্দাজ করে শাসক দল আর ওই পথ মাড়ায়নি।

    যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি এবং তৃণমূলের দুই প্রার্থী এক সময়ে অধীরের 'কাছের ছেলে' বলে পরিচিত ছিলেন। সেই জায়গা থেকে কাঞ্চনকে ২০১৩-তে বহরমপুর পুরভোটে প্রার্থী করেছিলেন অধীর। কিন্তু কংগ্রেস পরিচালিত পুরসভার পুরপ্রধান নীলরতন আঢ্যের প্রতি ক্ষোভ থেকে কাঞ্চন ২০১৬ সালে মোহন মোড়ে তৎকালীন তৃণমূলের মুর্শিদাবাদ পর্যবেক্ষক শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে কংগ্রেস কাউন্সিলর ভাঙিয়ে 'পুরপ্রধান হওয়ার লোভে' কাঞ্চন দল ত্যাগ করেছিলেন বলে বহরমপুরে প্রচার রয়েছে। এ দিকে কাঞ্চন তৃণমূলে যোগ দিতেই বহরমপুরের তৎকালীন পুরপ্রধান নীলরতন আঢ্য-সহ ১৩ জন কাউন্সিলর কলকাতায় গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূলে ঢুকে পড়েছিলেন। ওই ক্ষোভে কাঞ্চন তড়িঘড়ি এ বার তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন।

    এর পরে ২০২১-এ বিধানসভা নির্বাচনে বহরমপুর আসনে বিজেপি'র প্রার্থী হয়ে ৮৯ হাজার ৩৪০টি ভোট পেয়ে বিধায়ক হন কাঞ্চন। আর পুরকর্মী পদ ত্যাগ করে নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায় তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে পেয়েছিলেন ৬২ হাজার ৪৮৮টি ভোট এবং কংগ্রেসের মনোজ চক্রবর্তী ৪০ হাজার ১৬৭টি ভোট পেয়েছিলেন।

    এই অবস্থায় ২০২৩-এ বহরমপুর পুরভোট অনুষ্ঠিত হলে ২৮টি আসনের মধ্যে ২২টি আসনে জয়ী হয় তৃণমূল আর ছ'টি আসন পায় কংগ্রেস। পরে কংগ্রেসের এক জন কাউন্সিলর শাসক দলে jog দেন। ওই পুরভোটে শাসক দলের বিরুদ্ধে ভয় দেখিয়ে কংগ্রেস প্রার্থীদের নাম প্রত্যাহার ও ভোটের দিন ব্যাপক রিগিংয়ের অভিযোগ তুলেছিলেন বিরোধীরা।

    এ দিকে, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের নিরিখে বহরমপুর বিধানসভা আসনে প্রথম স্থানে ছিলেন অধীর চৌধুরী। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৮৩ হাজার ৪০৭টি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপি'র প্রার্থী নির্মল সাহা ভোট পেয়েছিলেন ৭৬ হাজার ৪৭৪টি। আর তৃণমূলের ক্রিকেটার প্রার্থী ইউসুফ পাঠান ৪৬ হাজার ৯৯৪টি ভোট পেয়েছিলেন। যদিও লোকসভা ভোটে ইউসুফ পাঠান শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেন।

    বহরমপুর বিধানসভা আসনে ভোট দেন বহরমপুর পুরসভা ও পাঁচটি পঞ্চায়েত এলাকার মানুষ। রয়েছে ভাকুড়ি-১ পঞ্চায়েত, দৌলতাবাদ, গুরুদাসপুর, হাতিনগর ও মণীন্দ্রনগর পঞ্চায়েত এলাকা।

    তৃণমূলের দলনেত্রী বহরমপুরে এসে নাম না করে বলে গিয়েছেন--'একা জিতে কী করবে?' ওই কথা ধার করে তৃণমূলীরাও সে কথা প্রচার করছে। তার পাল্টা অধীর বলেন, 'মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো ভুলে গিয়েছেন ২০০৪-এ তিনি এক মাত্র সাংসদ ছিলেন তৃণমূলের। একা বীর হনুমান লঙ্কা ধ্বংস করে এসেছিল। আপনি লোকসভা ভোটের আগে দাঙ্গা করিয়ে আমাকে হারিয়ে ভেবেছিলেন আপদ তাড়িয়েছেন। আমি নতুন করে আপনার বিপদ হয়ে এসেছি। আপদ তাড়িয়ে বিপদ ডেকে এনেছেন আপনি। একা থেকে দোকা হয়। সেটা আমি করে দেখাবো।'

    অন্য দিকে নাড়ুগোপাল ভোট প্রচারে বহরমপুর পুরসভার উন্নয়নকে হাতিয়ার করেছেন। তিনি বলছেন, 'ধারাবাহিক উন্নয়নের গতি বজায় রাখতে তৃণমূলকে ভোট দিন।' নাড়ু বলেন, 'ক্ষমতার লোভে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পাঁচ বছর পরে ফের তিনি ভোট ময়দানে নেমেছেন। তিনি একা জয়ী হয়ে কী করবেন!'

    অধীর তার পাল্টা বলেন, 'আমি ভয়েস অফ পিপল হতে চাই। মানুষের স্বর হতে চাই। আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সমাজ বিভাজনের বিরুদ্ধে লড়তে চাই। বহরমপুর শহর তথা মুর্শিদাবাদ জেলাকে অপশাসনের জেলা, লুটের শহর হিসেবে দেখতে চাই না। সে জন্য আমি লড়তে চাই। এই শহরের অতীত ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে হবে। যেখানে মানুষের উপরে জুলুম ও অত্যাচার হবে, সেখানে অধীর চৌধুরী বসে থাকবে না। আগেও কোনও দিন আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকিনি। তার পুনর্নবীকরণ করব।'

    তবে পথে নেমে ভোট প্রচারের পাশাপাশি কংগ্রেস ও তৃণমূলের জোর লড়াই চলছে সমাজ মাধ্যমের দেওয়ালে। AI দিয়ে ছবি তৈরি করে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে ছাড়েনি দু'পক্ষ। রাস্তায় নেমে জনসংযোগ প্রচারে আড়ম্বরের দিক বাকি দু'জনকে অনেকটাই পিছনে ঠেলে দিয়েছে নাড়ু। বহরমপুরের এক প্রবীণ ভোটার জানান, শাসক দলের ভয়ে অনেকেই প্রচারে নামতে সাহস পাচ্ছেন না। যদি হুমকির মুখে পড়তে হয়।

    ওই কথার তোয়াক্কা না করে নাড়ু বলছেন, 'সাধারণ বছর মানুষের সুখে-দুঃখে আমরা পাশে থাকি। তাঁদের কাজে আসি। আমার কাউন্সিলররা এলাকার মানুষের সঙ্গে জুড়ে থাকে। তাই প্রচারে মানুষ উৎসাহ নিয়ে আমার সঙ্গ দিচ্ছেন। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

    তার প্রমাণ প্রচারে বের হলে সাধারণ ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে বিজেপি প্রার্থীকে। ক্ষুব্ধ জনতা 'পাঁচ বছর কোনও খোঁজ-খবর নেননি' বলে মুখের উপরে অভিযোগ করেন। এমনকি পাড়া-ছাড়া করছেন বলেও অভিযোগ।

    এ প্রসঙ্গে কাঞ্চন বলেন, 'তৃণমূলের শেখানো বুলি আউড়াচ্ছে লোকজন সব। আসলে চোরেদের তাড়াতে বহরমপুর ও রাজ্যের মানুষ এ বার মন তৈরি করে ফেলেছেন। তৃণমূলের প্রার্থী নিজেকে উন্নয়নের রূপকার বলছেন। কিন্তু খাগড়া ও সৈয়দাবাদ এলাকার মানুষের জন্য নতুন কোনও বিকল্প রাস্তা তৈরি করতে পারেননি!'

    বহরমপুরের মানুষও ওই তিন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া নিয়ে কনফিউজ্ড! তাঁরাও মন তৈরি করে উঠতে পারেননি এখনও। তবে নারী সুরক্ষা ও নিরাপত্তা, বহরমপুরের পরিবেশ, উন্নয়ন, সামাজিক চেতনা, শৃঙ্খলা, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় নিয়ে চায়ের দোকানে, পাড়ার মোড়ে জোর চর্চা চলছে। অধীর, কাঞ্চন ও নাড়ুকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সচেতন মানুষ লাভ-ক্ষতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।

    ফলে বহরমপুর বিধানসভা আসনে চোখ জুড়ানো ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা অপেক্ষা করছে। যদিও তৃণমূল কংগ্রেস এই বহরমপুর আসনে কখনও জিততে পারেনি। এমনকি লোকসভা ভোটেও কোনও বার এগিয়ে থাকেনি। ফলে ওই কলঙ্ক ঘুচানোর সুযোগ রয়েছে। অন্য দিকে, ফের বিজেপি প্রার্থীর জয়ের শিকে ছিঁড়বে নাকি লোকসভা নির্বাচনে অধীরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বহরমপুরবাসী এ বার সুদে-আসলে কী উজাড় করে দেবেন! এখন সে দিকে নজর সকলের!

  • Link to this news (এই সময়)