গোর্খাদের সব ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহার, পাহাড় হিংসার স্মৃতি উসকে ঘোষণা শাহের, প্রশ্ন সুবিচার নিয়ে
প্রতিদিন | ১৬ এপ্রিল ২০২৬
‘গোর্খাদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত মিথ্যে মামলা রয়েছে সেগুলো তুলে নেওয়া হবে।’ ভোটের (West Bengal Assembly Election) মুখে পাহাড়ের মন ভেজাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের (Amit Shah) আশ্বাস ঘিরে চাঞ্চল্য। খারাপ আবহাওয়ার জন্য বুধবার লেবংয়ের জনসভায় যোগ দিতে পারেননি শাহ। পরে তিনি মালদহ থেকে পাঠানো সাত মিনিটের ভিডিও বার্তায় ওই আশ্বাস দেন। এরপরই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে ২০১৭ সালে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত সাব-ইন্সপেক্টর অমিতাভ মল্লিক-সহ অন্য দুই পুলিশ কর্মীর পরিবার কি তবে সুবিচার পাবেন না! একটানা ধর্মঘটের জেরে ভাঙচুর, নাশকতামূলক ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় জড়িতরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাবেন!
গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনে হিংসা, বনধ ও ভাঙচুরের অভিযোগে বিমল গুরুং-সহ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি ও বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন বা ইউএপিএ ধারায় মামলা রয়েছে। ২০১৭ সালের ১০৪ দিনের ধর্মঘটের সময় ভাঙচুর এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। তবে শুধু ২০১৭ সাল নয়। ১৯৮০-র দশকে জিএনএলএফ সুপ্রিমো সুবাস ঘিসিংয়ের নেতৃত্বে ওই আন্দোলন প্রথম সংগঠিত হয়। শুরুতে শান্তিপূর্ণ হলেও পরে সহিংস ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের চেহারা নেয়। প্রচুর হত্যাকাণ্ড এবং সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংগঠিত হয়। ওই সময়েরও প্রচুর মামলা এখনও ঝুলে রয়েছে। ১৯৮৮ সালে জিএনএলএফ, রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গঠিত হয় দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ। জিএনএলএফ পৃথক রাজ্যের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়। ২০০৫ সালে আরও একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে দার্জিলিংকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ছিল। ওই প্রস্তাব গোর্খাল্যান্ডের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিযোগ তুলে বিমল গুরুং ২০০৭ সালে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা গঠন করেন। পৃথক রাজ্যের দাবিতে ফের আন্দোলন শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০১১ সালে জিটিএ গঠনের প্রস্তাব বিধানসভায় পাস হয়।
কিন্তু ২০১৩ সালে তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের সঙ্গে সঙ্গে গোর্খাল্যান্ডের দাবি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে আন্দোলন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। ৫৪টি গাড়ি, ৭৩টি সরকারি দপ্তর পুড়ে ছাই হয়। ৯৩টি চা বাগান বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাতজনের প্রাণহানি ঘটে। রেল স্টেশন, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পঞ্চায়েত দপ্তর সহ বিভিন্ন সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর হয়। অক্টোবর মাসে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে অমিতাভ মল্লিক নামে এক সাব-ইন্সপেক্টর গুলিতে নিহত হন। এছাড়াও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে দুইজন পুলিশকর্মী নিহত হন।
পাহাড়ের রাজনৈতিক মহল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি ঘটনায় ফৌজদারি ও বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন বা ইউএপিএ ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বেশিরভাগ মামলা এখনও অমীমাংসিত রয়েছে। স্বভাবতই বুধবার গোর্খা ভোট (West Bengal Assembly Election) টানতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্পর্শকাতর বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, লোকসভা নির্বাচনে পাহাড়ে ব্যবধান বাড়িয়ে বিজেপির জয় নিশ্চিত করেছিলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সুপ্রিমো বিমল গুরুং। ওই আশ্বাস কি তারই উপহার! কারণ, পাহাড়ে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের হোতা ছিলেন গুরুং ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। মামলা রয়েছে তাদেরই বিরুদ্ধে।
এবার বিধানসভা নির্বাচনেও জোট করে পাহাড়-সমতলে নেপালি ভাষাভাষী অধ্যুষিত পাঁচটি আসনে বিমল গুরুংয়ের পছন্দের প্রার্থী দিয়েছে বিজেপি। গুরুং জানিয়েছেন, আসনগুলোতে প্রার্থীদের জিতিয়ে আনার দায়িত্ব তাঁর। তাই কি দায়বদ্ধতা ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না অমিত শাহরা! উঠছে প্রশ্ন। এই প্রসঙ্গে ভারতীয় গোর্খা জনশক্তি ফ্রণ্টের সুপ্রিমো অজয় এডওয়ার্ড বলেন, আমি আগেই বলেছিলাম, স্বার্থের জন্য বিমল বিজেপির সঙ্গে জোট করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সেটা আরও স্পষ্ট হল।”