এই সময়: তাঁর ভাষণে ‘সুনার বাংলা’র প্রসঙ্গ টেনে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী প্রচারসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিশানা করছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নমো ও তাঁর দলকে বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষী বলেও প্রায়ই আক্রমণ শাণান জোড়াফুল নেতারা। এ বার সেই বাংলাতেই ‘শুদ্ধ’ বাংলা ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে বলে ‘আক্ষেপ’ শোনা গেল নমোর কথায়।
ভোট প্রচারে বাংলা ও বাঙালির অষ্মিতাকে যখন প্রচারের হাতিয়ার করছে তৃণমূল, ঠিক সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী দাবি করলেন, অনুপ্রবেশের কারণে পশ্চিমবঙ্গে শুদ্ধ বাংলা এখন বলতেই শোনা যায় না। এর জন্য তৃণমূলের ‘তোষণের রাজনীতি’কে দুষে বুধবার মোদী বললেন, ‘তৃণমূলের কারণে শুধু বাংলা নয়, বাংলা ভাষাও খতম হয়ে যাচ্ছে।’
বাংলা উচ্চারণের এই বদলকে ‘ভোটের ইস্যু’ করতে একেবারে বুথ স্তরের কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘আপনারা ছোট ছোট ভিডিয়ো করুন। সেই ভিডিয়োতে বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলুন। তাঁদের বলার ধরন, উচ্চারণ ভালো করে মানুষকে শোনান। আর এখন আশপাশে যে বাংলা শুনতে পান, সেই ফারাকটা মানুষের কাছে তুলে ধরুন।’
২০২১–এর বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ ন্যারেটিভকে টেক্কা দিতে পারেনি বিজেপি। এ বারের ভোটে ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’ স্লোগান তুলেছে রাজ্যের শাসকদল। সেই ন্যারেটিভকে ভাঙতে পদ্ম–কর্মীদের কী করতে হবে, এ দিন তার টোটকা দিলেন স্বয়ং মোদী। ‘আমার বুথ সবথেকে মজবুত’ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বিজেপির বুথ সভাপতিদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন।
মোদী এবং বুথ সভাপতিদের মাঝে একজন দোভাষী ছিলেন, যাঁর দায়িত্ব ছিল মোদীর হিন্দিকে বাংলায় এবং বুথ সভাপতির বাংলাকে হিন্দিতে ট্রানস্লেট করা। পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি বিধানসভার একটি বুথের সভাপতি চন্দন প্রধানকে নমো বলেন, ‘আপনি এবং আপনারা আপনার বুথের মানুষকে বোঝান যে, তৃণমূলের কারণে বাংলা ভাষার এই অবস্থা হয়েছে। শুদ্ধ বাংলা তো এখন শোনাই যায় না। তৃণমূল ভোটে জেতার জন্য অনুপ্রবেশকারীদের এমন ভাবে আশ্রয় দিয়েছে, যে তাঁদের বলার ধরনের জন্যই শুদ্ধ বাংলা হারিয়ে যাচ্ছে।’
এরপরই প্রবীণ মানুষদের সঙ্গে কথা বলে ছোট ছোট ভিডিয়ো করে মানুষকে বোঝানোর কথা বলেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘এই ভাবেই বোঝাতে হবে, আগে কেমন করে বাংলায় কথা হতো আর এখন কেমন ভাবে বাংলায় কথা বলা হয়!’ মোদী আরও জানান, নমঃশূদ্র এবং মতুয়াদেরও বোঝাতে হবে, তাঁরা এ দেশের আশ্রয়ে আছেন। তাঁরা অতিথি। তাঁদের কেউ কখনও ভারত থেকে বাইরে পাঠাতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ, ‘বাংলা বলা যে ভাবে পরিবর্তন হয়েছে, সেটাই বোঝাতে হবে আপনাদের।’
এ নিয়ে মোদীকে তীব্র আক্রমণ করেছে তৃণমূল ও বামেরা। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তথা দমদমের তৃণমূল প্রার্থী ব্রাত্য বসুর কথায়, ‘উনি শুদ্ধ বাংলা বলা হচ্ছে, কী হচ্ছে না, সেটা বুঝলেন কী করে? নিজে বাংলা তো জানেন না। মুসলিমরা জলকে পানি বললে মোদীও তো জলকে পানিই বলেন! তা হলে কি তিনি অনুুপ্রবেশকারী?’ ব্রাত্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর সারা জীবনের গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, কত ধরনের বিদেশি ভাষার প্রভাব বাংলায় রয়েছে।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের কটাক্ষ, ‘উনি তো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বঙ্কিমদা বললেন। তারও আগে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতে গিয়ে বললেন চোলায় চোলায় বাজবে জোয়ের ভেরি— এখন কি বাঙালিকে মোদীর থেকে বাংলা বলা শিখতে হবে?’ সেলিমের সংযোজন, ‘রাজ্যে ২০-৩০ কিলোমিটার অন্তর অন্তর ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস বদলে যায়। আসলে ফ্যাসিস্টরা এই বৈচিত্র বুঝতে পারবে না।’