হেমাভ সেনগুপ্ত, তারাপীঠ
রাজ্য রাজনীতিতে বরাবর 'লো-প্রোফাইল' হয়েই থেকেছে বীরভূমের হাসন বিধানসভা কেন্দ্র। অথচ রাজ্যের ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলির মধ্যে প্রথম সারিতে থাকা তারাপীঠ মন্দির এবং এশিয়ার সবচেয়ে বড় গ্রাম (মাড়গ্রাম) এই বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যেই পড়ে। এ বার অবশ্য বিধানসভা ভোটে এই কেন্দ্রে হাই ভোল্টেজ লড়াই, সৌজন্যে কাজল শেখ।
বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি ও জেলা রাজনীতিতে তৃণমূলের অন্যতম বড় মুখ কাজল, এই প্রথম বিধানসভা ভোটে লড়ছেন। নিজের বাড়ি নানুর থেকে ৯০ কিমি দূরে হাসনে ইতিমধ্যেই নিজের জমি শক্ত করার কাজ সেরেছেন তিনি। তাঁর সমর্থনে নির্বাচনী জনসভা করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। দীর্ঘ 'দ্বন্দ্ব' মিটিয়ে সেই সভায় ছিলেন অনুব্রত মণ্ডলও, যিনি জেলে যাওয়ার পর থেকেই জেলা রাজনীতিতে কাজলের উত্থান। সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বীরভূমে কেষ্ট–কাজল দু'জনকে এক মঞ্চে নিয়ে সভা করে গিয়েছেন।
এ হেন হাসন বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২১–এ তৃণমূলের প্রতীকে জয়ী হয়েছিলেন চিকিৎসক অশোক চট্টোপাধ্যায়। বিধায়ক হলেও এলাকায় তাঁকে খুব একটা দেখা যায়নি বলে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মনে। এই অবস্থায় হাসন কেন্দ্র ধরে রাখতে এ বার তৃণমূল প্রার্থী করেছে কাজলকে। অন্য দিকে, এই কেন্দ্রে ফের নিজেদের দখল ফিরিয়ে আনতে এলাকার পোড়খাওয়া নেতা মিল্টন রশিদের উপরেই বাজি ধরেছে কংগ্রেস। আর গত বারের প্রার্থী নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে এ বারও আস্থা রেখেছে বিজেপি। সিপিএম প্রার্থী করেছে রামপুরহাট আদালতের তরুণ আইনজীবী কামাল হাসানকে।
কাজল প্রত্যেক জনসভায় বলছেন, জেলার ১১টি বিধানসভার মধ্যে তৃণমূল সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে জিতবে হাসনেই। যদিও তথ্য বলছে, ২০২৩–এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই বিধানসভা কেন্দ্রের ১৫টির মধ্যে তিনটি পঞ্চায়েত গিয়েছিল বাম–কংগ্রেস জোটের দখলে। ২০২৪–এর লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে বিজেপিও প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে।
এ দিকে, কাজলের বিরুদ্ধে 'বহিরাগত' তত্ত্ব তুলে এনেছে বাকিরা। মিল্টনের কথায়, 'বহিরাগত প্রার্থী থাকলে কী হয়, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে হাসন, তাই এখানকার মানুষ ঘরের ছেলের উপরেই ভরসা রাখবেন।' অন্য দিকে, নিখিল বলেন, 'কাজলের গুন্ডামিকে প্রশ্রয় দেবে না হাসনবাসী।' আবার কামাল হাসান বলেন, 'দ্বারকা সেতু, বনগ্রাম সেতু, মাড়গ্রাম স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নয়নের মতো বাকি থাকা কাজগুলি স্রেফ সিপিএম–ই করতে পারে, তা জানা বলেই মানুষ ভোটবাক্সে নিজেদের মতামত বুঝিয়ে দেবেন।'
তবে কাজলের 'মাথাব্যথা'–র অন্যতম কারণ স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার)। এখনও পর্যন্ত হাসনে প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষের নাম বাদ গিয়েছে, যাঁরা প্রত্যেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এই কেন্দ্রে প্রায় ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু মানুষের বসবাস। এ বার সংখ্যালঘু ভোট যদি কমে আর ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাবে তফশিলি জাতিভুক্ত ভোটাররা বিজেপির দিকে ঝুঁকে যান, তা হলে এই কেন্দ্রের ফলাফল বদলে যেতে পারে বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের।
মুর্শিদাবাদ ঘেঁষা এই বিধানসভা কেন্দ্রটি দীর্ঘ দিনই কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি ছিল। এই আসনে কংগ্রেসের সঙ্গে মূল লড়াই ছিল রেভলিউশনারি কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা আরসিপিআই–এর। ১৯৭৭–এ এই আসনে নির্দল প্রার্থী অসিত মালকে হারিয়ে জয়ী হন আরসিপিআই প্রার্থী ত্রিলোচন মাল। ১৯৮২–তে অসিত কংগ্রেসের হয়ে লড়লেও ফের হারেন। ১৯৮৭–তে প্রথম বার বিধায়ক হন অসিত। কিন্তু ১৯৯১–এ ফের হার স্বীকার করতে হয় তাঁকে। তবে ১৯৯৬ থেকে টানা তিনিই ছিলেন বিধায়ক। ২০১১–য় অসিত তৃণমূলে যোগ দিলেও হাসনের ফলাফল বদলায়নি। কিন্তু ২০১৬–য় অসিত হেরে যান তাঁর একসময়ের অন্যতম শিষ্য মিল্টন রশিদের কাছে। এ বার ফের সেই মিল্টন রশিদেই আস্থা রেখেছে দল।
এ বার শেষ পর্যন্ত যদি 'ঘরের ছেলে' বনাম 'বহিরাগত' তত্ত্ব কাজ করে যায়, তা হলে মিল্টন, নিখিলরা ভালো চাপে ফেলতে পারেন কাজলকে। আবার যদি 'সার'–কে হাতিয়ার করে সংখ্যালঘু ভোটারদের একজোট করতে পারে তৃণমূল, তা হলে তাদের জয়ে সমস্যা হবে না। এখন দেখার বিষয় সব হার্ডল পেরিয়ে কাজল প্রথম পরীক্ষাতেই সসম্মানে উত্তীর্ণ হতে পারেন, নাকি কংগ্রেসের পুরোনো গড় আবার কংগ্রেসকেই বেছে নেবে।