বাবরি প্রসঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন– একাধিক ইস্যুতে তোপ শাহর
দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৬ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের আগে রাজনৈতিক পারদ ক্রমশ চড়ছে। বুধবার উত্তরবঙ্গের একাধিক জনসভা থেকে রাজ্যের শাসক দলকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বাবরি মসজিদ প্রসঙ্গ টেনে তিনি সরাসরি নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
উত্তরবঙ্গের রাজগঞ্জ, ফালাকাটা-সহ একাধিক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শাহ বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের চ্যালা হুমায়ুন কবীরকে দল থেকে বার করে দিয়ে বাবরি মসজিদ বানাতে চায়। মমতাদিদি ও তাঁর ভাইপো কান খুলে শুনে নিন, এই মাটিতে বাবরি মসজিদ হবে না।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।
শুধু ধর্মীয় ইস্যু নয়, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, অনুপ্রবেশ— একাধিক বিষয়ে তৃণমূল সরকারকে নিশানা করেন তিনি। শাহর দাবি, ‘ভয় ও দুর্নীতি থেকে বাংলাকে মুক্ত করতে বিজেপি লড়াই করছে। এই কাজ তৃণমূলের পক্ষে সম্ভব নয়।’ সভামঞ্চ থেকে কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে স্লোগান দিয়ে তিনি বলেন, ‘মমতার সিন্ডিকেট সরকারকে সরাতে হবে।’ উপস্থিত জনতাকে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিতে বলেন তিনি।
শাহর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ। নাম না করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটাই ভাইপো, তাকেই মুখ্যমন্ত্রী করতে চান। কিন্তু মোদীজির কাছে দেশের সব মানুষই তাঁর পরিবার।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে মুখ্যমন্ত্রী হবেন ‘বাংলার মাটির ছেলে’, বাইরের কেউ নন।
এদিন উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতি দেন শাহ। তাঁর কথায়, বিজেপি সরকার গড়লে— চা-বাগানের শ্রমিকদের মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়া হবে। উত্তরবঙ্গে আধুনিক হাসপাতাল ও ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। নতুন শহর ও শিল্পনগর তৈরি হবে। যুবসমাজের কর্মসংস্থানের জন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘উত্তরবঙ্গ এতদিন বঞ্চিত ছিল। বিজেপি সরকার এলে উন্নয়নই হবে প্রধান লক্ষ্য।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘দিদি উত্তরবঙ্গের সঙ্গে বিমাতৃসুলভ আচরণ করেছেন। বাংলার বাজেট ৪ লক্ষ কোটি টাকা। তার থেকে মুসলমানদের দিয়েছে ৫,৭০০ কোটি টাকা। আর গোটা উত্তরবঙ্গের জন্য দিয়েছে মাত্র ১২০০ কোটি টাকা। আপনারা চিন্তা করবেন না। উত্তরবঙ্গের বিকাশ হবে আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত রাস্তা তৈরি করাবেন মোদী।’
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরব হন শাহ। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের আমলে ‘গুন্ডারাজ’ চলছে। এজন্য ভোটের দিন তৃণমূলের কর্মীদের ঘরে থাকার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। নারী সুরক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহিলাদের সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে নিষেধ করেন। বিজেপি ক্ষমতায় এলে মহিলারা রাতেও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন।’
অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত সুরক্ষা নিয়েও কড়া বার্তা দেন অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, বিজেপি সরকার এলে সীমান্ত সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হবে। তাঁর কথায়, ‘পাখিও পারাপার করতে পারবে না।’ পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
এদিনে খারাপ আবহাওয়ার কারণে দার্জিলিংয়ের সভায় যেতে না পারলেও ভিডিয়োবার্তার মাধ্যমে পাহাড়ের ইস্যুতে রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেন শাহ। তাঁর অভিযোগ, গত দেড় বছরে তিনবার বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হলেও রাজ্য তা গ্রহণ করেনি। তিনি বলেন, ‘বিজেপি সরকার এলে গোর্খাদের সব সমস্যার সমাধান করা হবে। মিথ্যা মামলাও প্রত্যাহার করা হবে।’
দুর্নীতি ইস্যুতে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শাহ। শিক্ষক নিয়োগ, গরু পাচার, আবাস প্রকল্প— একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘জনগণের টাকা যারা লুট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, অমিত শাহের এই ধারাবাহিক আক্রমণের জেরে রাজ্যের রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে বিজেপির আক্রমণ, অন্যদিকে তৃণমূলের পাল্টা জবাব— সব মিলিয়ে ভোটের আগে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা এখন চরমে।