বাংলায় সম্প্রীতির বার্তা দিতে ডুয়ার্সে মমতার সঙ্গে হাঁটলেন ফাদার, ইমাম, পুরোহিত, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী
বর্তমান | ১৬ এপ্রিল ২০২৬
ব্রতীন দাস, চালসা: সম্প্রীতির বার্তা দিতে ডুয়ার্সে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে হাঁটলেন চার্চের ফাদার, মসজিদের ইমাম, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কিংবা পুরোহিত। তৃণমূল নেত্রীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে জনতার উদ্দেশে তাঁদের বক্তব্য, ‘বাংলায় এখন যেমন সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে বাস করছেন, আগামী দিনেও যেন তেমনটাই থাকে। ধর্মের নামে হানাহানি কখনওই কাম্য নয়।’
এত জনজাতির বাস যে, ডুয়ার্সকে ‘মিনি ভারতবর্ষ’ বলা হয়। বুধবার সন্ধ্যায় মঙ্গলবাড়ি থেকে চালসা গোলাই পর্যন্ত নেত্রীর পদযাত্রা ঘিরে তারই যেন এক টুকরো রঙিন কোলাজ ফুটে ওঠে। মমতাকে স্বাগত জানাতে হাজির ছিলেন আদিবাসী, নেপালি, রাভা, রাজবংশী সহ বিভিন্ন জনজাতির শিল্পীরা। ধামসা-মাদলের তালে আদিবাসী ও বৈরাতি নৃত্যের ছন্দে উচ্ছ্বসিত তৃণমূল সুপ্রিমো মিশে যান ডুয়ার্সের মানুষের সঙ্গে। ওড়ানো হয় বেলুন। পদযাত্রা শেষে চালসা গোলাইয়ে নেত্রী শামিল হন জনজাতি শিল্পীদের নৃত্যে।
দু’বছর আগে পয়লা বৈশাখের বিকেলে যে পথে হেঁটেছিলেন মমতা, এদিনও সেই পথেই তাঁকে স্বাগত জানাতে দুপুর থেকে ভিড় জমান কাতারে কাতারে জনতা। আকাশে মেঘ, কয়েক পশলা বৃষ্টিও হয়েছে। কিন্তু এসবে তোয়াক্কা না করে সকাল সকাল সংসারের কাজ সামলে নাতির হাত ধরে চালসায় এসেছিলেন ৭০ বছরের ফতেমা খাতুন। বললেন, দিদি আমাদের বিপদের বন্ধু। তিনি আসছেন। ফলে ঘরে থাকি কী করে! নাগরাকাটার মাথাচুলকার বাসিন্দা ফতেমা বার্ধক্য ভাতা পান। বললেন, ছেলে ফরিদুল ইসলাম রাজমিস্ত্রির কাজ করে। ছেলেমেয়ে নিয়ে এমনিতেই ঠিকমতো সংসার চালাতে পারে না। তারউপর আমাকে মাঝেমধ্যে ছেলের কাছে হাত পাততে হত। লজ্জা লাগত। কিন্তু উপায় থাকত না। নাতিটা এটা ওটা কিনে দেওয়ার আবদার করে। আমি পয়সা পাই কোথায়! এখন অবশ্য অসুবিধা হয় না। বার্ধক্যভাতা পাই। সাত বছরের নাতির আবদার মেটাতে পারি। বউমা টুম্পার মুখেও হাসি ফুটেছে। মাসে দেড় হাজার টাকা করে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছে। ওই টাকা জমিয়ে একটা টিভি কিনেছে বউমা। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ৫২ বছরের সফিয়া খাতুন। বললেন, আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য দিদি যে সুবিধা দিয়েছেন, তা ভুলি কী করে।
গত অক্টোবরে ভয়াবহ দুর্যোগের স্মৃতি এখনও টাটকা নাগরাকাটার মানেকা বানু, সুফিয়া বেগমের। বললেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরই দিদি ছুটে এসেছিলেন। দুর্গতদের সাহায্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল প্রশাসন। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারালেও দু’বেলা খাবারের অভাব হয়নি। দিদির উপকার ভুলি কী করে।
নববর্ষের সন্ধ্যায় রাস্তার দু’ধারে অপেক্ষমান জনতার উদ্দেশে যখন হাত নাড়ছিলেন মমতা, নমস্কার জানাচ্ছিলেন, তখন নাগরাকাটার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী জ্ঞানোত্তার দিকসু, চলসার ইমাম মহম্মদ রবি, পুরোহিত চন্দন মুখোপাধ্যায়, চার্চের ফাদারকে সঙ্গে নিয়ে হাতে হাত ধরে বাংলার সম্প্রীতি রক্ষার বার্তা দিলেন। আবেদন করলেন, আকাশে দুর্যোগের মেঘ কেটে যাবে, কিন্তু ডুয়ার্সে যেন জাতপাত আর ধর্মের নামে অশান্তির মেঘ না ঘনায়।