ভয় অতীত! উন্নয়নে আস্থা রেখে ব্যবধান বাড়াতে প্রত্যয়ী তৃণমূল
বর্তমান | ১৬ এপ্রিল ২০২৬
সোহম কর, জয়নগর: কুলতলি বিধানসভা এলাকায় তরমুজ নাকি খুব সস্তা। অন্তত এখানকার হাটের দোকানিরা এমন কথাই বলেন। জামতলা এলাকার একটি হাটে সেই তরমুজ বিক্রি করতে গিয়ে দোকানি গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছেন, ‘লালে লাল ২০ টাকা! বাইরে সবুজ।’ কিনতে এসে এক ক্রেতা বলেই ফেললেন, ‘এত লাল-সবুজ করিসনি। দেখছিস না সব বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে।’ তরমুজের গায়ে টোকা মারতে মারতে দোকানি বললেন, ‘ভোটের বাজার! বিক্রি হলেই হল।’ এই কুলতলি এমন এক বিরল বিধানসভা, যা ২০১১ ও ২০১৬ সালে সিপিএমের হাতে ছিল। তারপর তৃণমূল এল। এই বছরও তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন বিদায়ী বিধায়ক গণেশচন্দ্র মণ্ডল। সিপিএমের প্রার্থী এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক প্রবীণ নেতা রামশংকর হালদার। গণেশবাবু কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনেই করছেন না। আর সিপিএম বলছে, লড়াই চতুর্মুখী। বিজেপি আবার বাম ভোটের দিকে তাকিয়ে।
জয়নগর থেকে কুলতলির দিকে গাড়ি ছুটলে দু’পাশে সবুজ খেত। কিছু এলাকায় রাস্তা খারাপ। সেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী। তবে চারপাশের দেওয়ালে একছত্র আধিপত্য তৃণমূলের। কুলতলি মানে বাঘের ভয়। মৈপীঠ এলাকায় প্রায়ই বাঘ বেরিয়ে পড়ে। তৃণমূল প্রার্থী গণেশবাবু বলছেন, ‘আসলে কুলতলিতে এক সময় খুন, সন্ত্রাসের ভয় ছিল। এখন সেসব নেই। বর্তমানে শুধুই উন্নয়ন। রাস্তাঘাট, আলো সব হয়েছে এখানে।’ তার সঙ্গে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকল্প। জয়নগর থেকে ট্রেন ধরে কলকাতায় যাচ্ছিলেন খালেক মোল্লা। ম্যাজিক গাড়িতে বসে বলছিলেন, ‘আমরা যুবসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছি বাড়িতে বসেই। মানুষ উপকৃত হয়েছে। তৃণমূল ছেড়ে অন্যদিকে যাবে কেন মানুষ?’ ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে সিপিএম পেয়েছিল ৩৭ শতাংশ ভোট। তৃণমূল ৩১ এবং এসইউসিআই ২৪ শতাংশ ভোট। বিজেপি তখন ৫ শতাংশে দাঁড়িয়ে। সেই বিজেপি ২০২১ সালে চলে গেল ৩১ শতাংশের আশপাশে। তৃণমূল ৫১ শতাংশ। আর জামানত গেল সিপিএম-এসইউসিআইয়ের। সিপিএম প্রার্থী রামশংকরবাবু বলছেন, ‘মানুষ ভোট দিতে পারলে ফল ভালো হবে। এবার লড়াইয়ে পাঁচ প্রার্থী। তৃণমূল-বিজেপি-সিপিএম-কংগ্রেস-এসইউসিআই।’ তিনি বলছেন, ‘উন্নয়ন বলে কিছু হয়নি। পর্যটন কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। পানীয় জলের সমস্যা আছে। তৃণমূলের গণেশবাবু বলছেন, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল আরও ভালো করতে হবে। আমাদের হাসপাতালে এখনও সিজার হয় না। এটাও চালু করতে হবে।
বিজেপির এবারের প্রার্থী তরুণ গবেষক মাধবী মহলদার। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সংখ্যালঘু সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করছেন। বলছেন, ‘সন্ত্রাসের পরিবেশ এখনও আছে। মানুষ এখন পরিবর্তন চাইছেন। নদী বাঁধের সমস্যা আছে।’ তাঁর মত, ‘লড়াই এখানে তৃণমূল বনাম বিজেপির। তৃণমূলকে হঠাতে বামপন্থীরা নিশ্চয়ই আমাদের ভোট দেবেন। তবে গণেশবাবুর সাফ কথা, গত বছর ৪৮ হাজারের কাছাকাছি ব্যবধান ছিল। এবার তা দ্বিগুণ হবে।
একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো দল নয় এসইউসিআই। ২০ বছর আগে তাদের একটানা বিধায়ক ছিল। এখনও তাদের হাতে ১০ শতাংশের আশপাশে ভোট রয়েছে। এসইউসিআই প্রার্থী শংকর নস্কর বলছেন, ‘এবার এখানকার লড়াই ত্রিমুখী। বিজেপি-তৃণমূল আর আমরা। এখানে সিপিএম বলে কিছু নেই। তাঁদের বেশিরভাগই রামের দিকে চলে গিয়েছে। বাকিরা তৃণমূলে। বামপন্থী বলতে আমরাই রয়েছি।’
এখন তরমুজের মতো কুলতলির ভিতরটা লাল নাকি গেরুয়া? কিংবা বাইরেটা কি ঘন সবুজ? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৪ মে।