• রায়বাঘিনীর গড়কে উন্নয়নে ঘিরেছেন সমীর, লড়াই থেকে বহু দূরে বিজেপি
    বর্তমান | ১৬ এপ্রিল ২০২৬
  • বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, উদয়নারায়ণপুর: জাঙ্গিপাড়া থানা এলাকার জাঁদা গ্রামের বাসিন্দা রেনুকা সামন্তর গা, হাত-পায়ে ব্যথা হত খুব। পাড়ার ডাক্তারকে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু খুব একটা উপকার হয়নি। কেউ একজন পরামর্শ দিয়েছিলেন, উদয়নারায়ণপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে যেতে। ওখানে ভালো চিকিৎসা হয়। তাই মাস চারেক আগে হাসপাতালের আউটডোরে দেখিয়েছেন অশীতিপর রেনুকাদেবী। ওষুধ খেয়ে বেশ সুস্থ ছিলেন। ব্যথা আবার চাগাড় দেওয়ায় ফের আউটডোরে দেখাতে এসেছেন। বললেন, এক সময় এসব জায়গায় ডাক্তার দেখাতে আসার কথা ভাবতেই পারতাম না। এখন শুধু আমি নয়, আমাদের এলাকায় যাঁরা অসুস্থ হন, তাঁরা এখানেই ভরতি হন। চিকিৎসার পর তাঁরা সুস্থ হওয়ায় আমাদেরও ভরসা বেড়েছে। 

    উন্নয়নের এই ভরসাটুকুই এবারের বিধানসভা ভোটে অক্সিজেন জোগাচ্ছে শাসকদলকে। হাসপাতালের রাস্তা ছাড়িয়ে সামনের দিকে এগতেই দামোদরের উপর বিরাট চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বকপোতা ব্রিজ। আগে যে লজঝড়ে ব্রিজটি ছিল, তার সলিল সমাধি হয়েছে দামোদরেই। তার কিছু কঙ্কাল ভেসে আছে জলের উপর। ব্রিজ ধরে সামনের দিকে এগলে যতদূর চোখ যায়, মসৃণ রাস্তা। তার ধার ঘেঁষে কংক্রিটের শক্তপোক্ত গার্ডওয়াল। এক বা দু’কিমি নয়, টানা ২২ কিমি। বন্যার অভিশাপ মাথায় নিয়ে যে উদয়নারায়ণপুর এক সময় দিন কাটাত, সেখানে এখন খুশির হাওয়া অনেকটাই। দামোদর অববাহিকার এই শস্যশ্যামলা ভূ-অঞ্চল ৫০ হাজার কিউসেক জলের চাপ ধরে রাখতে পারত না। তাই প্রতি বর্ষায় বন্যা যেন অবধারিত ছিল। এই দীর্ঘ গার্ডওয়াল দেড় লক্ষ কিউসেক জল ধরার ক্ষমতা রাখে, বলছেন এলাকার মানুষজন। ৫০০ কোটি টাকায় গড়া এই উদয়নারায়ণপুর মাস্টার প্ল্যান এখন ফিকে করে দিয়েছে এলাকাবাসীর আতঙ্কের দিনযাপন। রাজাপুর বাসস্ট্যান্ডের ধারে ডাব বিক্রি করেন চূড়ামণি দাস। বলছিলেন, আমাদের কানুপাট মনশুকা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় একটা ইলেকট্রিক চুল্লি হবে শুনছি। আমাদের এলাকায় কোনো ইলেকট্রিক চুল্লি নেই। যদি হয়, তাহলে আমরা খুশি হব।  

    এই ছোটো ছোটো খুশির উপকরণ দিয়েই উদয়নারায়ণপুরকে ঘিরেছে প্রশাসন। এখানে পরপর তিনবারের বিধায়ক তথা এবারের তৃণমূল প্রার্থী সমীর পাঁজার বক্তব্য, আমরা পথশ্রী প্রকল্পের আওতায় ৭৫টি রাস্তা পাকা করেছি। মজা দামোদরের উপর ১৮টি অস্থায়ী কাঠের সেতু ভেঙে স্থায়ী কংক্রিটের ব্রিজ তৈরি হয়েছে। বেতাই-ডিহিভুরশুট এবং রাজাপুর-মুন্সিরহাট রাজ্য সড়ক দুই লেনে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ভোল বদলেছে রাজাপুর-পাঁচারুলের রাস্তারও। আগে স্টেট জেনারেল হাসপাতালে বেডের সংখ্যা ছিল ৬০টি। তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। হাইস্কুল, প্রাথমিক স্কুল, কলেজগুলির পরিকাঠামো আমূল বদলে গিয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে জলের ব্যবস্থা করেছি আমরা। পনেরো বছর আগে উদয়নারায়ণপুরের যে চেহারা ছিল, তা যে আপাদমস্তক বদলে গিয়েছে। উদয়নারায়ণপুর পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি লক্ষ্মীকান্ত দাস বলেন, আমরা প্রচারে শুধু তৃণমূল সমর্থকদের কাছেই যাচ্ছি না, বরং আমাদের যাঁরা বিরোধী, তাঁদের কাছে গিয়েও ঘাসফুলে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। কেন তাঁদের ভোট চাইছি, তাও বিশদে বোঝানো হচ্ছে। এ রাজ্যে আলুচাষিরা দাম পাচ্ছেন না বলে বিজেপি গলা ফাটাচ্ছে, অথচ কেন পাচ্ছেন না, সেকথা বলছে না। সারের দাম কেন বাড়াচ্ছে কেন্দ্র, তার কোনো জবাব তাদের কাছে নেই। আমরা আলুচাষিদের সেকথাই বোঝাচ্ছি।

    লড়াই থেকে বহু দূরে বিজেপি। তৃণমূলের উন্নয়নের ফিরিস্তিকে আমল দিতে চান না এবারের বিজেপি প্রার্থী প্রভাকর পণ্ডিত। তাঁর স্পষ্ট কথা, এখানে তৃণমূলের সঙ্গে আমাদের কোনো লড়াই নেই। উদয়নারায়ণপুর চালাচ্ছে গুন্ডারা। তাই গোটা এলাকাকে সন্ত্রাস মুক্ত করা আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ। বাম আমলে যে সন্ত্রাস এখানে হতো, তা এখন ১০০ গুণ বেড়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে ভয়হীনভাবে বাঁচতে পারেন, তার জন্যই আমাদের লড়াই। বিজেপির এই কথাকে অবশ্য আমল দিতে নারাজ সমীর পাঁজা। তাঁর কথায়, শুনেছি উনি তিনবার হেরে হ্যাটট্রিক করেছেন। এবার চতুর্থবারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি কে, কোথায় থাকেন এলাকার মানুষ জানেন না। বুথভিত্তিক এলাকার কথা তো বাদই দিলাম, তিনি যদি এলাকার সবকটি পঞ্চায়েত আর গ্রামের নাম বলতে পারেন, তাহলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। বিজেপি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়।

    উদয়নারায়ণপুরের ইতিহাস বড়ো বর্ণময়। তদানীন্তন ভূড়িশ্রেষ্ঠ রাজ্যের মহারানি রানি ভবশঙ্করী বর্তমানের হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, বর্ধমানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সংস্কৃতি, শিক্ষা ও শিল্পকে অতি উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। ঢেলে সেজেছিলেন সেনাবাহিনী। পাঠানদের যুদ্ধে হারিয়ে কুর্নিশ কুড়িয়েছিলেন দিল্লির মসনদের। মোগল সম্রাট আকবর ভবশঙ্করীকে রায়বাঘিনী উপাধিতে ভূষিত করেন। বাম আমলে বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যাওয়া রায়বাঘিনীর ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছে তৃণমূল প্রশাসন। তাঁর সাম্রাজ্যকে সামনে আনতে শুধু যে রানি ভবশঙ্করীর নামে পার্ক বা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে তা নয়, নিজের শিকড়কে ফের ছুঁতে পেরেছে উদয়নারায়ণপুর। উন্নয়ন দিয়ে রায়বাঘিনীর গড়কে ঘিরেছে তৃণমূল। ভোট বাক্সে তাই ফের জোড়াফুল ফুটবে, আশায় আছেন সমীর পাঁজা।
  • Link to this news (বর্তমান)