অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: চন্দননগরের তেমাথা শিবতলা এলাকায় বাপিদার দোকান। আদতে চায়ের দোকান হলেও প্রতিদিন প্রবীণ দোকানি ১৫ রকমের পদ সাজিয়ে বসেন। মেলে রুটিও। অনেকেই রাতের খাবার কিনতে আসেন এখানে। বসে চা-চক্র। দোকানের একদিকে তৃণমূলের অফিস। অন্যদিকে রয়েছে স্কুল। চন্দননগরের বামপ্রার্থী মণীশ পান্ডা এই স্কুলেরই শিক্ষক। সন্ধ্যা গড়িয়েছে আগেই। বাপিদার দোকানে তখন জমজমাট আড্ডা। স্বাভাবিকভাবেই চর্চার বিষয়বস্তু হল নির্বাচন। আলোচনা শুরু করেছিলেন দুই পুরানো কিন্তু পরস্পর পরিচিত খদ্দের। চর্চায় ছিল ভবানীপুর কেন্দ্র। কিন্তু দ্রুত তা পৌঁছায় চন্দননগরে। মাঝবয়সি এক খদ্দেরের দাবি, চন্দননগরের তৃণমূল প্রার্থী ইন্দ্রনীল সেন বদলে গিয়েছেন। কেমন সেই বদল? ধোপদুরস্ত পোশাকের খদ্দের বলেন, চন্দননগরে একটি বিশেষ মর্গ তৈরি করেছেন ইন্দ্রনীল। অনেক নাগরিকের সন্তানরা দূর-দেশে থাকেন। যেসব একলা প্রবীণ প্রয়াত হন, তাঁদের দেহ সেখানে সংরক্ষণ করা যায়। বিষয়টি ঠাহর করে অন্য খদ্দের বললেন, ঠিক বলেছিস, ওটা ভালো কাজ। ভালো ভাবনাও। তুলনায় নবীন এক খদ্দের এসে চা নিয়ে বসেছেন। তিনি বলেন, বিধায়ক এখন অনেক বেশি সময় চন্দননগরে থাকেন। একটা সচল অফিস আছে। নাগরিকদের চাহিদা পূরণের জন্য সক্রিয় কর্মী রাখা আছে।
ততক্ষণে চা-চক্রে ভিড় বেড়েছে। একজন খদ্দের ফুট কাটলেন, দীপাঞ্জনের (বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন গুহ) কী হবে? ভিড় থেকে একজন বললেন, ওঁকে চন্দননগরের কোনো পুরানো গলিতে ছেড়ে দিলে একা বের হতে পারবেন? কেউ মুচকি হাসলেন। কেউ কেউ এতটাই জোরে হাসলেন যে, পথচলতি মানুষ খানিক থমকাল। হাসির রেশ কাটতেই একজন বললেন, অনেক কাজ হয়েছে। চন্দননগর এবার ইন্দ্রনীলের জন্য ফাঁকা মাঠ। তাহলে মাস্টারমশাই (মণীশ পান্ডা)? দু’জন খদ্দের সমস্বরে বলে উঠলেন, লড়াই আছে। কিন্তু বাংলায় সাদা-নীল আর চন্দননগরে ইন্দ্রনীল। রুটি নিয়ে ফিরে যাওয়ার আচমকা থমকালেন এক তরুণ। বললেন, দীপাঞ্জনকে যে কেন বারবার বিজেপি প্রার্থী করে! সবাই তাকালেন আক্ষেপের উৎসের দিকে। দেখে মনে হল, নিয়মিত খদ্দের নন। তবে সংকেত যা দেওয়ার দিয়ে গেলেন।
এসবের কিছুই জানেন না প্রার্থীরা। তাঁরা সেদিনও সকলে প্রচারে মগ্ন। রাতদিন এক করে আলোর শহরে নিজ নিজ দলের জন্য প্রদীপ জ্বালাতে ছুটছেন তাঁরা। দলীয় সমর্থকদের মাঝে ছিলেন মণীশবাবু। বলেন, গঙ্গার হাওয়ায় ঘূর্ণি থাকে। চন্দননগর এবার আমাদের। দীপাঞ্জনও প্রচারের ফাঁকে বললেন, চন্দননগরে পদ্ম ফুটবেই। ঘর্মাক্ত মুখ মুছতে মুছতে ইন্দ্রনীল বলেন, মানুষ অফুরান ভালোবাসা দিচ্ছেন। দিদির ঝুলিতে চন্দননগর ছিল, এবারও ব্যবধান বাড়িয়েই থাকবে।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কল্পবিজ্ঞানের কাহিনিতে চরিত্ররা আকছার অচেনা গলা শোনে। রাত সাড়ে দশটায় ঐতিহ্যের স্ট্রান্ড রোড আচমকা সেই রকম হয়ে উঠেছিল। অচেনা নারীকণ্ঠ বলে উঠল, ভোট হচ্ছে বোঝা দায়। পুরুষ কণ্ঠের উত্তর, ম্যাচটা যে ইন্দ্রনীল একপেশে করে দিয়েছে। কান টেনে চোখ কচলে দেখা গেল, কোথায় কল্পবিজ্ঞান! তরুণ-তরুণী গঙ্গাপাড়ের নিঝুম কোণা ছেড়ে উঠছেন। একান্ত আলাপ শেষে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হঠাৎ খেয়াল পড়েছিল, ভোট এসেছে।