• কুমোরটুলি টু কুঁদঘাট, নববর্ষে মাটনেই হাহাকার
    এই সময় | ১৬ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: আক্ষরিক অর্থে সাতসকালেই বাজারে গিয়ে খাসির মাংসের দোকানে লাইনে দাঁড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। বুধবার সকাল তখন সাড়ে ৭টা। কুমোরটুলির সুজন শীল ঠিক করেছিলেন, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন দেড় কেজি মাংস কিনবেন। কিন্তু বিধি বাম। সুজনের কথায়, ‘বাজারে যে দোকান থেকে বরাবর খাসির মাংস কিনি, সেখানে সকাল সাড়ে ৭টায় গিয়ে দেখি, মাংসের দোকানে অন্তত ৫০ জনের লাইন। এত দিনের পরিচিত, তবু আমার মুখের উপর দোকানদার বলে দিলেন, আর লাইনে দাঁড়াবেন না। যাঁরা দাড়িয়ে আছেন, তাঁদেরই সবাইকে মাংস দিতে পারব না।’

    দক্ষিণ শহরতলির কুঁদঘাটের ছবিটা এ দিন কুমোরটুলির চেয়ে অন্য রকম কিছু ছিল না। পুটিয়ারির ব্যানার্জি পাড়ার সুব্রত গুহ বলছেন, ‘আমি সকাল ৮টা নাগাদ বাজারে গিয়ে খাসির মাংসের দোকানে লাইন দিয়েছিলাম ৩৫ জনের পরে। আমার পরে লাইনে ছিলেন আরও জনা পঁচিশেক। দোকানদার গোড়াতেই বলে দেন, ‘লাইনে দাঁড়াচ্ছেন ভালো কথা, তবে মাংস যে দিতে পারব, তার গ্যারান্টি নেই। আমি এক কেজি চেয়েছিলাম, আমাকে ৭০০ গ্রাম, আর আমার ঠিক পরে দাঁড়ানো একজনকে ৩০০ গ্রাম মাংস দিয়ে দোকানদার জানান, মাংস শেষ।’

    পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে উদরপূর্তির উৎসব। সেখানেই এ দিন বহু বাঙালি বড়সড় ধাক্কা খেলেন ছুটির দিন খাসির মাংস থেকে বঞ্চিত হয়ে। এলাকা ও মানের নিরিখে খাসির মাংসের দাম এখন ঘোরাফেরা করছে কেজি প্রতি ৮৬০ টাকা থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে। কিন্তু আলু দিয়ে পাতলা ঝোল বা গা–মাখা কিংবা কষা মাংস খাওয়ার জন্য কেজিতে হাজার টাকা দিতে বাঙালি তৈরি হলেও কেন মাংস পেল না?

    সল্টলেকের এ ই মার্কেটের মহম্মদ কালাম আনসারি এ দিন সকাল সাড়ে ৯টাতেই দোকান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন মাত্র চারটে খাসি কেটে বিক্রি করার পরে। তাঁর বক্তব্য, ‘পাইকারি বাজারে খাসির দাম এখন অনেকটা চড়া। তার উপর জোগানও কম। আমি চারটে খাসি কেটে বিক্রি করেছি ঠিকই, তবে তার প্রত্যেকটায় আমার দু’হাজার টাকা অর্থাৎ মোট ৮ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। যত বেশি খাসি কাটব, তত বেশি লোকসান।’ একই বক্তব্য টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের অদূরে অশোকনগর বাজারের বিক্রেতা রহমত কুরেশির।

    তিনিও এ দিন সকাল সাড়ে ৯টায় খদ্দেরদের জানিয়ে দেন, মাংস আর নেই। রহমত জানান, এ রকম ছুটির দিনে তাঁর দোকানে ২৫–৩০টি খাসি কাটা হয়, তবে এ দিন ১২টিতেই তাঁকে থেমে যেতে হয়েছে।

    ভবানীপুরের যদুবাবুর বাজারে ‘বেঙ্গল মিট শপে’ এখন খাসির মাংসের দাম কেজি প্রতি হাজার টাকা। সেই দোকানের মালিকও জানালেন, অন্যান্য বছর পয়লা বৈশাখে যেখানে তিনি ২০টি খাসি কাটেন, সেই জায়গায় এ দিন ১২টির বেশি কাটতে পারেননি। ওই ব্যবসায়ীর কথায়, ‘রাজাবাজারের হাট (পাইকারি বাজার) থেকে বেশি সংখ্যক খাসি তোলা যাচ্ছে না। দাম খুব চড়া। লোকসানের মুখে আমাদের পড়তে হচ্ছে।’ বাঁশদ্রোণী সুপার মার্কেটে খাসির মাংসের দোকানের তৌহিদ হোসেন লস্কর বলেন, ‘হোলির সময় থেকে পাইকারি বাজারে খাসির দাম যে ভাবে চড়েছে, তাতে কেজিতে ৯৬০ টাকায় মাংস বিক্রি করেও লাভ থাকছে না।’

    প্রবীণ ব্যবসায়ী রহমত কুরেশির মতে, ‘বাংলায় খাসির ফার্ম তেমন নেই। এ রাজ্যের চাহিদা মেটায় উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থানের খাসি। বাংলায় খাসির ফার্ম ভালো ভাবে গড়ে উঠলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।’

  • Link to this news (এই সময়)