প্রথমে জনগণনা দিয়ে শুরু করুন, তার পরে আসন পুনর্বিন্যাস— সরকারের বিরুদ্ধে এই সুরেই আক্রমণ শানান অখিলেশ যাদব। পাল্টা কড়া ভাষায় জবাব কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। বৃহস্পতিবার তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতের সাক্ষী থাকল সংসদ। মহিলা সংরক্ষণ কার্যকরের জন্য আসন পুনর্বিন্যাস বিল পেশ হতেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং সমাজবাদী পার্টি সুপ্রিমো অখিলেশ যাদবের (Akhilesh Yadav) মধ্যে তুঙ্গে ওঠে বাগযুদ্ধ। বৃহস্পতিবার বাকবিতণ্ডা শুরু হয় ‘কোটা-র মধ্যে কোটা’, বিশেষ করে মুসলিম মহিলাদের সংরক্ষণ প্রসঙ্গ নিয়ে।
সংসদে তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে তিনটি বিল পাশ করাতে চাইছে কেন্দ্র। তিনটি বিল হলো— মহিলাদের সংরক্ষণের জন্য ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল, লোকসভার সাংসদ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার জন্য আসন পুনর্বিন্যাস বিল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল। এ দিন বিল পেশের কথা উত্থাপন হতেই সরব হন সমাজবাদী পার্টি সুপ্রিমো। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার নারী সংরক্ষণের জন্য এত তাড়াহুড়ো করছে কেন? আগে জনগণনা দিয়ে শুরু করুন।’ এখানেই শেষ নয়, তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘মহিলা সংরক্ষণ বিলে মুসলিম মহিলাদের জন্য আলাদা কোটা রাখা হচ্ছে না কেন? মুসলিম মহিলারাও দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার অংশ, তাই তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা উচিত।’ এর জবাবে অমিত শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণ দেওয়া সংবিধানসম্মত নয়। তিনি বলেন, ‘সংবিধান ধর্মভিত্তিক কোটা অনুমোদন করে না এবং পুরো দেশের মহিলাদের জন্য সমানভাবে সংরক্ষণই সরকারের লক্ষ্য।’
বাদানুবাদ তুঙ্গে ওঠে যখন অখিলেশ যাদব কেন্দ্রের তাড়াহুড়ো নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আগে জনগণনা (Census) করা উচিত, তারপর সংরক্ষণ বা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া চালানো উচিত।’ একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ তোলেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণনা দেরি করছে যাতে জাতিভিত্তিক গণনার দাবি এড়ানো যায়। যাদবের কথায়, ‘কেন্দ্র জনগণনায় বিলম্ব করছে কারণ তারা জানে এটি যখন হবে, তখন জাতিভিত্তিক জনগণনার দাবি জানানো হবে এবং ওরা তা চায় না।’ পাল্টা শাহ অভিযোগ করেন, দেশের সামনে ভুল বার্তা দিচ্ছেন অখিলেশ। জনগণনার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এবং তিনি বিধানসভাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে জাতিভিত্তিক জনগণনাও হবে।
বিরোধীদের কটাক্ষ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব, ‘বর্তমানে বাড়িঘরের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। বাড়িগুলো কোনও নির্দিষ্ট জাতির অন্তর্ভুক্ত নয়। সমাজবাদী পার্টি সম্ভব হলে বাড়িগুলোকেও জাতি হিসেবে চিহ্নিত করবে। আমি সদনকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, জনগণনা জাতিভিত্তিক গণনার সঙ্গেই করা হবে।’
এর পরেই সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ধর্মেন্দ্র যাদবও জানান, সমাজবাদী পার্টি সাংবিধানিক কারণে প্রস্তাবিত তিনটি বিলের তীব্র বিরোধিতা করছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই পদক্ষেপগুলি আসলে সংবিধানকে ‘বিকৃত’ করার প্রচেষ্টা। বিশেষ করে জনগণনা প্রক্রিয়া থেকে আসন পুনর্বিন্যাসকে আলাদা করা নিন্দনীয়।
অন্যদিকে, সরকার জানায়, মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করতে এই বিলগুলি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং এটি একটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’। তবে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, ডিলিমিটেশনের সঙ্গে এই সংরক্ষণকে যুক্ত করে রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
এসপি-র পক্ষ থেকে ধর্মেন্দ্র যাদব বলেন, ‘অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী এবং মুসলিম নারীদের জন্য বিধান অন্তর্ভুক্ত না থাকলে সমাজবাদী পার্টি মহিলা সংরক্ষণ বিল সমর্থন করবে না।’ তিনি সরকারকে প্রস্তাবিত বিলগুলো প্রত্যাহার করে তার পরিবর্তে ২০২৩ সালে পাস হওয়া আইনটি বাস্তবায়ন করারও আহ্বান জানান।
সমাজবাদী পার্টিকে তাদের সব টিকিট মুসলিম মহিলাদের দিতে আমরা বাধা দিচ্ছি না
এই পর্যায়ে শাহ জোর দিয়ে বলেন যে, সংবিধান অনুযায়ী ধর্মভিত্তিক সংরক্ষণ অনুমোদিত নয়। শাহ বলেন,‘ধর্মের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য যে কোনও ধরনের সংরক্ষণ অসাংবিধানিক।’ এর জবাবে অখিলেশ যাদব প্রশ্ন তোলেন যে মুসলিম জনসংখ্যা ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের আওতার বাইরে পড়ে কি না এবং এই বিষয়ে সরকারের অবস্থানের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর জবাবে অখিলেশকে তীব্র কটাক্ষ করে শাহ বলেন, ‘সমাজবাদী পার্টিকে তাদের সব টিকিট মুসলিম মহিলাদের দিতে আমরা বাধা দিচ্ছি না।’
সব মিলিয়ে, মহিলা সংরক্ষণ বিল এখন শুধুমাত্র নারী প্রতিনিধিত্বের বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই—এটি ধর্মভিত্তিক সংরক্ষণ, জনগণনা, এবং দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও বড় বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।