এই সময়, ডায়মন্ড হারবার: কলিকাতা সহরের চার দিকেই ঢাকের বাজ্না শোনা যাচ্চে, চড়্কীর পিঠ সড়্ সড়্ কচ্চে, কামারেরা বাণ, দশলকি, কাঁটা ও বঁটি প্রস্তুত কচ্চে—, সর্ব্বাঙ্গে গয়না, পায়ে নূপুর, মাতায় জরির টুপি, কোমোরে চন্দ্রহার, সিপাই পেড়ে ঢাকাই সাড়ি মালকোচা করে পরা, তারকেশ্বরে ছোবান গাম্চা হাতে বিল্বপত্র বাঁদা সূতা গলায় যত ছুতর, গয়লা, গন্ধবেণে ও কাঁশারির আনন্দের সীমা নাই— ‘আমাদের বাবুদের বাড়ি গাজোন!’
কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় ‘কলিকাতার চড়ক পার্ব্বণ’–এর বর্ণনা দিয়েছেন এ ভাবেই (উপরের লেখায় বানান অপরিবর্তিত)। এত বছর পরেও চৈত্র সংক্রান্তি, শিবপুজো কিংবা গাজনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে বই কমেনি। নববর্ষকে বরণ করতে চৈত্র মাসের শেষ চার দিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দারাও মেতে ওঠেন গাজন উৎসবে। পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে শিবের ভক্ত হয়ে সন্ন্যাসীর উপবাস করেন। গত রবিবার থেকে শুরু হয়েছিল উপবাস। তীব্র রোদ–গরম উপেক্ষা করে শিবের উপাসনায় মেতেছিলেন আট থেকে আশি সকলেই।
বিষ্ণুপুরের বড়কাছারি, ডায়মন্ড হারবারের বোলসিদ্ধি, রায়দিঘির কাশীনগর, কুলপির রামকৃষ্ণপুর ও কাকদ্বীপ–সহ মন্দির বাজারের প্রাচীন শিব মন্দিরে হাজার হাজার ভক্তদের ঢল নেমেছিল। ভক্তদের উপবাসের কষ্ট লাঘব করতে মন্দির চত্বরেই বসেছিল গাজন গানের আসর। ভক্তদের কেউ কেউ শিব-দুর্গা সেজে অভিনয়ও করছেন।
মন্দির লাগোয়া পুকুরে স্নান সেরে নতুন বস্ত্র গায়ে দিয়ে উত্তরীয় পরে উপবাসের সূচনা হয়। শিবের আরাধনার পরে সেই উত্তরীয় ভক্তদের গলায় পরিয়ে দেন মন্দিরের পুরোহিত। ভক্তদের নানা কৃচ্ছ্রসাধনের ছবি ফুটে ওঠে এই উৎসবকে ঘিরে। ২০-২৫ ফুট উচ্চতার কাঠের মাচা তৈরি করা হয়। নীচে রাখা থাকে বঁটি–সহ নানা অস্ত্র। পুরুষ ভক্তরা সেই মাচা থেকে ওই অস্ত্রের উপরে ঝাঁপ দেন। ঝাঁপ দেওয়ার পরে শরীরে লোহার শলাকা বিঁধে নাচতে থাকেন তাঁরা।
অন্য দিকে, কুল–সহ বিভিন্ন কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া হয় মন্দিরের মেঝেয়। তার উপরে গড়াগড়ি দেন মহিলা ভক্তেরা। যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণ উপেক্ষা করেই মন্দির প্রাঙ্গণ ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। মল্লিকা সদার্র নামে এক ভক্তের কথায়, ‘সন্ন্যাসী হওয়ার পরে বান ফোঁটানো ও ধারালো বটির উপরে ঝাঁপ দেওয়া দীর্ঘদিনের রীতি।’ ডায়মন্ড হারবারের বোলসিদ্ধি শিব মন্দিরের জয়দেব ভট্টাচার্য বলছেন, ‘সেই ছোট থেকে সন্ন্যাসী হচ্ছি। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই বান ফুঁড়ি। উপবাসের কিছুদিন আগে এই লোহার শলাকা কামারশালা থেকে তৈরি করাই।’
কুলপির আর এক ভক্ত অলোকা হালদার বলেন, ‘বছর শেষে এই চারটে দিন কী ভাবে যে কেটে যায়, বুঝতেই পারি না। কোনও কষ্টই মালুম হয় না। গাজনের গান শুনে দিব্যি সময় কেটে যায়।’ সুন্দরবনের লোকসংস্কৃতির গবেষক ধূর্জটি নস্কর মনে করেন, ‘গ্রাম–বাংলার লোকজন বছর শেষে শিবের উপাসক হয়ে কৃচ্ছ্রসাধন করেন। সম্বৎসরের সব দুঃখ-গ্লানি মুছে এ ভাবেই নতুন বছরকে বরণ করেন তাঁরা।’