সংসদে ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হোক মহিলাদের জন্য। নরেন্দ্র মোদী সরকারের আনা সংবিধান সংশোধনী এবং আসন পুনর্বিন্যাস-সহ তিন বিলের বিরোধিতা করে এই দাবিই তুলল তৃণমূল। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করতে চেয়ে বৃহস্পতিবার সংসদে তিনটি বিল পেশ করেছে কেন্দ্র। তৃণমূলের প্রশ্ন, মহিলাদের জন্য কেন ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হবে? ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা হলে তবেই কেন্দ্রের প্রস্তাবকে সমর্থন করবে বাংলার শাসকদল। শুধু তা-ই নয়, তৃণমূলের অভিযোগ, আসলে মোদী সরকারের লক্ষ্য ‘মহিলা সশক্তিকরণ’ নয়, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে!
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অবশ্য এই তিন বিলের সঙ্গে রাজনীতিকে না মেলানোরই বার্তা দিয়েছেন। তবে তিনি এ-ও জানান, বিরোধীরা এই বিলের বিরোধিতা করলে রাজনৈতিক ভাবে তাঁর সুবিধা হবে। কাকলির পরেই ভাষণ দিতে উঠে মোদী বলেন, ‘আপনারা এই বিলের বিরোধিতা করলে আমার কিছুটা রাজনৈতিক লাভ হতে পারে। তবে, সবাই যদি একমত হন, গোটা দেশ লাভবান হবে।’ ২৫-৩০ বছর আগেই মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ হওয়া উচিত ছিল বলেও জানান তিনি।
মহিলা সংরক্ষণ বাড়ানোর প্রস্তাবে নৈতিক সমর্থন থাকলেও, লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করা হবে বলে বুধবারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ‘ইন্ডিয়া’ ব্লক। সেই বৈঠকে তৃণমূলের প্রতিনিধিও ছিলেন। বিরোধী জোটের বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা মেনেই বৃহস্পতিবার লোকসভায় বিরোধীরা কেন্দ্রের তিন বিলের বিরোধিতা করেছে। তৃণমূলের তরফে বক্তৃতা করেছেন মুখ্য সচেতক কাকলি ঘোষ দস্তিদার। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের সাংসদ কাকলি বলেন, ‘সংসদে আমাদের দলের সাংসদদের মধ্যে ৫২ শতাংশ মহিলা। শুধু সংসদেই নয়, বিধানসভাতেও তৃণমূলের মহিলা বিধায়কের সংখ্যা অনেক। আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহিলাদের হেরে যাওয়া আসনে প্রার্থী করেন না। উনি মহিলাদের জিতিয়েও আনেন। এটা দেশের আর অন্য কোনও রাজনৈতিক দল করে দেখাতে পারেনি।’
মোদী সরকারের তিন বিলকে ‘ছদ্মবেশী আইন’ আখ্যা দিয়ে কাকলির বক্তব্য, মহিলা সংরক্ষণের সঙ্গে আসন পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি জুড়ে দেওয়ার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তৃণমূল সাংসদের প্রশ্ন, গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুরে’-এর সময়ে সংসদে বিশেষ অধিবেশন ডাকার দাবি জানিয়েছিলেন বিরোধীরা। তখন তাতে রাজি হয়নি সরকার। কিন্তু এখন তড়িঘড়ি বিশেষ অধিবেশন ডেকে কেন এই বিল পাশ করার কথা ভাবা হলো? কাকলি বলেন, ‘এমন একটা সময়ে এই বিল আনা হলো, ঠিক যখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলছে। ভোট বৈতরণী পার করতেই এই বিল আনা হয়েছে।’
কাকলির আরও অভিযোগ, এই বিলটি মোদী সরকার এমন ভাবে তৈরি করেছে যাতে, কোনও পুরুষ সাংসদকে নিজের আসন ছাড়তে না হয়। তিনি বলেন, ‘মহিলা সংরক্ষণের সঙ্গে আসন পুনর্বিন্যাস এমন ভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে মহিলাদের ভাগ্য পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে আটকে যায়। আমাদের দল তৃণমূল মহিলাদের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করে। আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর জন্য লড়েছে। ১৯৯৮ সালে উনি মহিলা সংরক্ষণের পক্ষে সরব হয়েছিলেন। এখন সংসদে বিজেপির মহিলা সদস্য ১১ শতাংশ। আর তৃণমূলের ৫২ শতাংশ। তাই আমরা ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।’ মহিলাদের অধিকার নিয়ে বলতে গিয়ে বাংলার বিধানসভায় পাশ হওয়া অপরাজিতা বিলের প্রসঙ্গও টেনেছেন কাকলি।
আসন পুনর্বিন্যাস করতে গিয়ে জাতি-ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কাকলি। তিনি বলেন, ‘জাতি-ধর্মের ভিত্তিতে এলাকা পুনর্বিন্যাস করে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো ধ্বংস করতে চাইছেন আপনারা। আপনারা কেন এত দিন ৩৩ শতাংশ মহিলাকে সংসদে আনেননি? আমাদের তো আছে। আপনাদের নেই কেন? কারণ, আপনাদের উদ্দেশ্য অন্য।’
আসন পুনর্বিন্যাসের কাজ সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন করতে ‘ডিলিমিটেশন কমিশন’ গড়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদী সরকার। তা নিয়েও কটাক্ষ করেছেন কাকলি। সেই সূত্রেই টেনে এনেছেন নির্বাচন কমিশনকেও। তৃণমূল সাংসদ বলেন, ‘ডিলিমিটেশন কমিশন তৈরি করার কথা বলছেন? এক দিকে, নির্বাচন কমিশন আছে। তারা দেশটাকে শেষ করে দিল। সাংসদদের সঙ্গে কী ভাবে কথা বলতে হয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানেন না। আমাদের প্রতিনিধিদলকে বলেছে, গেট লস্ট! গেট আউট! নির্বাচন কমিশনে হচ্ছে না, এখন ডিলিমিটেশন কমিশন! এই কমিশন স্বৈরাচারী কমিশন হবে। দেশের মানুষকে সর্বনাশ করবে।’