এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: বাংলার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) মামলার শুনানির দিন, গত সোমবারই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী— প্রয়োজনে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে আদালত। শেষমেশ ‘অ্যাজুডিকেশনে’ বাদ পড়া ভোটারদের জন্য কিছুটা স্বস্তি দিয়ে সেই বিশেষ ক্ষমতাই প্রয়োগ করল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার সিজেআই সূর্য কান্ত ও বিচারপতি বাগচীর বেঞ্চের যে নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে আপলোড হয়েছে, সেই অনুযায়ী, ‘অ্যাজুডিকেশনে’ বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে যাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি করে অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল নাম তোলার নির্দেশ দেবে, তাঁরা এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট টাইমলাইন বেঁধে দিয়েছে আদালত। বাংলায় প্রথম দফায় ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট হওয়ার কথা ২৩ এপ্রিল। আর বাকি ১৪২টি আসনে ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। সেই সময়সীমার কথা মাথায় রেখে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, যথাক্রমে ২১ ও ২৭ এপ্রিলের মধ্যে যাঁদের আবেদন মঞ্জুর করবে ট্রাইব্যুনাল, তাঁরা ওই দুই দফায় ভোট দিতে পারবেন। এই ভোটারদের নাম সমেত সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশ করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। এই নির্দেশকে স্বাভাবিক ভাবেই স্বাগত জানিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও ‘সার’ প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের অসন্তোষের কথা জানিয়ে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া, ‘আমরা প্রথম থেকেই বলেছি, জ্ঞানেশ কুমার বাংলায় আসুন। পুরো বেঞ্চ নিয়ে আসুন। দিল্লিতে বসে বোঝা সম্ভব নয়, বাংলায় সার কী ভাবে হচ্ছে।’
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ন্যায়বিচারের স্বার্থে সুপ্রিম কোর্ট প্লেনারি পাওয়ার অথবা সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এক্ষেত্রে কেন এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হলো শীর্ষ কোর্টকে?
আইনজ্ঞরা বলছেন, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, যে বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট রয়েছে, সেখানে মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা যায়। বাংলায় দু’দফায় ভোটের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা পেরিয়ে গিয়েছে যথাক্রমে ৬ ও ৯ এপ্রিল। ফলে ওই সব কেন্দ্রে ভোটার লিস্ট ফ্রিজ় হয়ে গিয়েছে। তারপরে আর নতুন নাম তালিকায় যুক্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূলের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, যে হেতু তালিকা ফ্রিজ় হয়ে গিয়েছে, তাই ট্রাইব্যুনাল যাঁদের আবেদন মঞ্জুর করবে, তাঁদের ভোট দেওয়ার সুযোগ হবে কী করে? শুনানির সময়ে সিজেআই সূর্য কান্ত পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন, এই আবেদনে সায় দিতে হলে ইতিমধ্যে যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় উঠে গিয়েছে, তাঁদের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিচারপতি বাগচী অবশ্য শুনানির শেষ পর্যায়ে জানিয়েছিলেন, আদালত প্রয়োজন অনুযায়ী ১৪২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা প্রয়োগের কথা বিবেচনা করতে পারে। শেষমেশ এ দিন সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেই নির্দেশ দিল আদালত। আগামী ২৪ এপ্রিল মামলার পরবর্তী শুনানি। অর্থাৎ, ততদিনে প্রথম দফার ভোট মিটে যাবে। এর আগে এই মামলায় বেনজির ভাবে জুডিশিয়াল অফিসারদের ‘সার’–এর ‘অ্যাজুডিকেশনে’র নথির নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করতেও ১৪২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিল শীর্ষ আদালত।
কিন্তু ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তির পরে ২৭ লক্ষের মধ্যে কত নাম উঠতে পারে?
কমিশনের হিসেব, ১৩ এপ্রিল থেকে ট্রাইব্যুনাল শুনানি শুরু করেছে। ১৯টি ট্রাইব্যুনালে প্রতিদিন গড়ে ১০টি করে আবেদনের শুনানি হচ্ছে। শুনানির নিষ্পত্তি না–হলে পরদিন আবার শুনানির ডেট পড়ছে। এক একদিন গড়ে সবক’টি শুনানির নিষ্পত্তি হচ্ছে বলে ধরে নিলেও এখনও পর্যন্ত ৭৬০–এর মতো নিষ্পত্তি হয়ে থাকতে পারে। এই গতিতে কাজ হলে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত বড়জোর ২১০০–এর মতো আবেদনের নিষ্পত্তি হবে। তাঁদের মধ্যে আবার কতজনের নামে ট্রাইব্যুনাল সিলমোহর দিল, তা এ দিন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়।
বাংলায় ‘সার’–এর একেবারে শেষ পর্যায়ে ‘অ্যাজুডিকেশনে’ বাদ পড়েছিলেন প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটার। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় পাঁচশো জন ও দুই পড়শি রাজ্য ওডিশা–ঝাড়খণ্ডের একশো জন করে মোট সাতশো জন বিচারক বা জুডিশিয়াল অফিসার প্রায় ৬০ লক্ষ ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকাভুক্ত ভোটারের নথি যাচাই করেছিলেন। সেখানে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে পারবেন বলে জানায় সুপ্রিম কোর্ট। ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালগুলিতে প্রায় ৩৪ লক্ষ ৩৫ হাজার আবেদন জমা পড়ে। ধোঁয়াশা রয়েছে, ২৭ লক্ষ বাদ পড়া ভোটার যদি এখানে আবেদনের সুযোগ পান, তা হলে মোট আবেদনের সংখ্যাটা ৩৪ লক্ষ হলো কী করে? আইনজ্ঞদের একাংশের ব্যাখ্যা, ‘অ্যাজুডিকেশনে’র পরে সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে যে প্রায় ৩২ লক্ষ ভোটারের নাম উঠেছে, তাঁদের একাংশের নাম বাদ দেওয়ার জন্যও বাড়তি আবেদন জমা পড়েছে ট্রাইব্যুনালে। সেই কারণে সংখ্যাটা বেড়ে গিয়েছে। এ দিন শীর্ষ আদালত আরও একটা বিষয় জানিয়েছে। সেটা হলো, ২১ ও ২৭ এপ্রিলের মধ্যে যাঁদের আবেদন মঞ্জুর করবে ট্রাইব্যুনাল, শুধুমাত্র তাঁদের নামই তালিকায় উঠবে। ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা মানেই যে তাঁর নাম লিস্টে উঠবে, তা নয়।
এ দিন সুপ্রিম রায় নিয়ে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমি বারবার সবাইকে বলেছিলাম ধৈর্য রাখুন। ট্রাইব্যুনালে অ্যাপ্লাই করুন। আজ নয় কাল আপনারা নিশ্চয়ই ভোটাধিকার পাবেন। আমি খুব খুশি। বিচারব্যবস্থার জন্য গর্বিত। এটা আমার কেসের উপরে হয়েছে। মা মাটি মানুষ জিন্দাবাদ। আজ (বৃহস্পতিবার) আমার থেকে খুশি আর কেউ নেই।’ তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী প্রথম দফার ভোটের সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট কমিশন প্রকাশ করবে ২১ তারিখ। ওটা পেয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট বুথের তৃণমূল নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, তাঁরা যেন রাতের মধ্যে ভোটার স্লিপ তৈরি করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন। যাতে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছিল, তাঁরা ভোট দিতে পারেন। একই ভাবে ২৯ তারিখের ভোটের আগে ২৭ তারিখ লিস্ট বেরোলে একই পদক্ষেপ করতে হবে। বাঁকুড়ার ওন্দার সভা থেকে অভিষেক বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট বলেছে ২১ তারিখের মধ্যে অ্যাপিলে থাকা যে কেসগুলি হয়ে যাবে, সেই সব নাম তালিকায় তুলতে হবে। তৃণমূল কোর্টে লড়াই করেও জেতে, মানুষের ময়দানে লড়াই করেও জেতে।’
রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের পাল্টা বক্তব্য, ‘সার আমরা করিনি। নির্বাচন কমিশন করেছে। বেছে বেছে মতুয়াদের নাম, উদ্বাস্তুদের নাম প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে বাদ দিয়েছে তৃণমূল। যাতে মানুষের মধ্যে আক্রোশ আর বিভ্রান্তি তৈরি করা যায়।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমি এখনও বলছি, পুরোনো ভোটার লিস্টেই ভোট করিয়ে দিন, দরকারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভাবে চাইছেন, সে ভাবেই ভোট করিয়ে দিন। তারপরেও তৃণমূল ক্ষমতায় আসবে না। আমরা এখনও বলছি, সার প্রক্রিয়ায় আমরা সন্তুষ্ট নই। আমাদের ফর্ম সেভেনের শুনানি হয়নি।’