• এক দিনে তিন বিল এনেও জারি অস্বস্তি, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসেও একরোখা বিরোধীরা
    এই সময় | ১৭ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি: ‘রাজনৈতিক মাইলেজ’ নিয়ে হুঁশিয়ারি, ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ নেওয়ার আহ্বান, আবেদন — জলে গেল সব প্রচেষ্টাই। ঢাকঢোল পিটিয়ে এক দিনে তিনটি বিল এনেও (যার একটি অন্যটির সঙ্গে যুক্ত) বৃহস্পতিবার দিনের শেষে নরেন্দ্র মোদীর সরকার যে একেবারে নিশ্চিন্তে রইল, তেমন বলা যাচ্ছে না। তার প্রথম কারণ, খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপর্যুপরি আশ্বাস সত্ত্বেও বিরোধীরা একরোখা হয়েই আছে। তাদের বক্তব্য, মহিলা সংরক্ষণ বিলকে ঢাল করে আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অঙ্কের বিচারে বিজেপি নিজেদের সুবিধেজনক জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, যে তিনটি বিল এ দিন লোকসভায় পেশ করা হলো, সেগুলি পাশ করানোর জন্য লোকসভা এবং রাজ্যসভায় প্রয়োজনীয় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (ভোটাভুটি আজ, শুক্রবার বিকেল চারটেয়) অন্তত অঙ্কের হিসেবে সরকারের হাতে নেই।

    এ দিন বিশেষ সংসদীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই লোকসভায় তিনটি বিল পেশ করে কেন্দ্র। প্রথমটি ২০২৩–এ পাশ হওয়া ‘নারীশক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ (মহিলা সংরক্ষণ) বিল কার্যকর করার জন্য সংবিধান সংশোধনী৷ দ্বিতীয়টি ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের প্রেক্ষাপটে সারা দেশের আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন বিল এবং তৃতীয়টি হলো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের আসন পুনবির্ন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল৷ এই বিলগুলি পেশ হওয়ার পরেই প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বিরোধী শিবির৷ তাদের সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে বিল পেশ করার বিষয়ে ডিভিশন বা ভোটাভুটি করতে বাধ্য হয় সরকার৷ তাতে সরকারের পক্ষে ভোট দেন ২৫১ জন৷ বিপক্ষে ১৮৫ জন সাংসদ৷

    তিনটি বিল নিয়ে রাজনৈতিক আবহ উত্তপ্ত হচ্ছিল গত ক’দিন ধরেই। বিরোধীরা যে লোকসভার ফ্লোরে স্বর সপ্তমে চড়াবে, সে ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। বিশেষ করে দক্ষিণের রাজ্যগুলি থেকে প্রতিবাদের সুর ছিল উচ্চগ্রামে। এ দিন সকালে সংসদের অধিবেশন শুরু আগেই প্রস্তাবিত ডিলিমিটেশন বিলের একটি প্রতিলিপি পুড়িয়ে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন বলেন, ‘এটা একটা কালা কানুন। তামিলদের নিজভূমে শরণার্থী করে রাখার চেষ্টা চলছে।’ দক্ষিণের বিরোধীদের বক্তব্য, যে ভাবে আসন পুনর্বিন্যাসের ব্যবস্থা হচ্ছে, তাতে উত্তর ভারতের থেকে লোকসভায় আসন সংখ্যা বাড়ানোর চক্রান্ত স্পষ্ট। স্ট্যালিনের মতো দক্ষিণের বিরোধী নেতাদের বক্তব্য, জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার মতোই এই পরিকল্পনা।

    স্ট্যালিনের এই দাবির প্রতিধ্বনি এ দিন শোনা যায় সংসদের বিশেষ অধিবেশন শুরু হতেই। বিরোধীদের ক্ষোভ সামাল দিতে ময়দানে নামেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে। হাতিয়ার করেন মহিলা সংরক্ষণ বিলকে। বলেন, ‘আপনারা যদি এর বিরোধিতা করেন, তা হলে রাজনৈতিক ফায়দা আমার হবে। কিন্তু একসঙ্গে এগোলে কারও রাজনৈতিক লাভ–ক্ষতি হবে না। আমাদের কোনও কৃতিত্ব চাই না। যে মুহূর্তে সর্বসম্মতিতে এই বিলগুলি পাশ হবে, আমি আপনাদের (বিরোধীদের) ধন্যবাদ জানিয়ে একটি বিজ্ঞাপন দিতে প্রস্তুত। তাতে আপনাদের সকলের ছবি থাকবে। আপনারা কৃতিত্ব চাইছেন? নিন না! আমি তো আপনাদের ব্ল্যাঙ্ক চেক দিতে রাজি।’ তাঁর আহ্বান, ‘আমি এই কক্ষকে বলতে চাই, কোনও রকম বিভ্রান্তি বা উগ্রতার গণ্ডিতে কেউ থাকবেন না। আমি, আমরা বা আপনারা নয় — আমি বলছি আমাদের সকলের কথা। এমন বিভ্রমে আমাদের কারও থাকা উচিত নয় যে, আমরা মহিলাদের হাতে কিছু তুলে দিচ্ছি। তাঁদের প্রাপ্য হক তাঁদের দিচ্ছি যা থেকে দশকের পর দশক তাঁরা বঞ্চিত। পাপমুক্ত হওয়ার এটাই সুযোগ।’ বিরোধীদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে মোদী বলেন, ‘বিলের বিরোধিতা করলে মাশুল গুণতে হবে৷ যাঁরা মহিলা সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতা করছেন, মেয়েরা তাঁদের ক্ষমা করবেন না।’

    তবে বিরোধীরা এতে গলেনি। তাদের বক্তব্য, মহিলা সংরক্ষণের আবেগের আড়ালে কেন্দ্র অন্যায় ভাবে আসন পুনর্বিন্যাসের ছক কষেছে। এ দিন কোচবিহারে মাথাভাঙার সভায় তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমি নিজেও সংসদে মহিলাদের জন্য ৩৩% সংরক্ষণের পক্ষে লড়েছি। কিন্তু আপনারা কেন মহিলা বিলের সঙ্গে ডিলিমিটেশনকে যুক্ত করলেন? কারণ খুব সহজ। আপনারা বাংলা ভাগ করতে চান। আপনারা বৃহত্তর অর্থে দেশকেই ভাগ করতে চান। ডিলিমিটেশন বিল আলাদা। মহিলা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ আলাদা। এটি আরও নাম কাটার এবং এনআরসি কার্যকর করার একটি ফাঁদ। এই ফাঁদে পা কেউ দেবেন না।’ তাঁর সংযোজন, ‘উদ্ধব ঠাকরে, এমকে স্ট্যালিন, অখিলেশ, তেজস্বী — সবাই আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। তাঁরা বুঝতে পারছেন যে, বিজেপি বাংলাকে টার্গেট করছে। ওরা নির্বাচনকে সম্পূর্ণ একতরফা করার চেষ্টা করছে।’

    অন্য দিকে সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, ‘কেন ডিলিমিটেশন ছাড়া এখনই মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করাচ্ছেন না? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পদের মোহ তাঁর নেই। তা–ই যদি হয়, তা হলে ডিলিমিটেশন ছাড়াই মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করিয়ে দেখান। এত দ্বিধা কীসের! সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের প্রশ্ন, ‘এই বিল তো আগেও আনার সুযোগ ছিল। আপনারা এখনই কেন আনলেন? কোন সেনসাসের ভিত্তিতে এটা করা হচ্ছে? আমরা সবাই মহিলা সংরক্ষণের পক্ষে। কিন্তু যে নতুন ম্যাপ আপনারা লুকিয়ে লুকিয়ে করে বসে আছেন, তার কী হবে!’

    এর আগেই অবশ্য আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিরোধীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা চালিয়েছেন মোদী। বোঝাতে চেয়েছেন, দক্ষিণের রাজ্যগুলির বিরোধীদের আশঙ্কা অমূলক। তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি দেশের কোনও রাজ্য, তা উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম যেখানেই হোক— কারও সঙ্গে অবিচার হবে না। আসনের অনুপাত বদলাবে না, বৃদ্ধি একই অনুপাতে হবে। যদি এ ক্ষেত্রে গ্যারান্টি শব্দটি ব্যবহার করতে হয়, আমি সেটাই করব। যদি প্রতিশ্রুতি শব্দটি ব্যবহার করতে হয়, সেটাও করব। যদি এই শব্দগুলির কোনও ভালো প্রতিশব্দ তামিল ভাষায় থাকে, আমি সেটা বলতেও রাজি। শুধু একটি বিষয়ই পরিষ্কার করে দিতে চাই। আমি শব্দের খেলা খেলে কাউকে বিভ্রান্ত করতে চাই না।’

    প্রধানমন্ত্রীর এ হেন অবস্থানকে ‘নরম’ আখ্যা দিচ্ছেন অনেক রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল। তাঁদের প্রশ্ন, বিল পাস করানোর মতো দুই–তৃতীয়াংশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের হাতে নেই বলেই কি বিরোধী শিবিরের প্রতি এমন অবস্থান নিচ্ছেন মোদী? শুধু মোদী নন, সংসদীয় রাজনীতির হালফিলের হালচাল সম্পর্কে যাঁরা ওয়াকিবহাল, তাঁদের একাংশ এ দিন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কথারও মধ্যেও বিরোধীদের আক্রমণ করার সেই আগমার্কা ঝাঁজ পাননি। বরং তথ্য–পরিসংখ্যান পেশ করে শাহ বিরোধীদের বোঝাতে চেয়েছেন, ডিলিমিটেশন নিয়ে যা প্রচার করা হচ্ছে, তা ভুল। পরিসংখ্যান পেশ করে তিনি শাহ বলেন, ‘এই তিনটি বিল নিয়ে একটি বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে দক্ষিণের রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা কমে যাবে এবং তাদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে৷ কিন্তু আপনারা দেখুন, কর্নাটকে বর্তমানে ২৮টি লোকসভা আসন রয়েছে। তা বেড়ে ৪২ হবে। এবং প্রতিনিধিত্বের শতাংশও প্রায় অপরিবর্তিত থাকছে।’

    তার আগেই অবশ্য ডিলিমিটেশন নিয়ে শাহকে এক প্রস্ত কটাক্ষ ছুড়ে দেন প্রিয়াঙ্কা। তাঁর অভিযোগ, মহিলা সংরক্ষণের নামে আসন পুনর্বিন্যাসের যে ছক হয়েছে, তার রচয়িতা অমিত শাহ। ওয়েনাড়ের সাংসদের কথায়, ‘আপনারা প্রথমত ওবিসি–দের বাদ দিয়ে মহিলা সংরক্ষণের কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, বিষয়টি পরে দেখা যাবে, টেকনিক্যাল ইস্যু। এমন একটি বিলকে হাতিয়ার করে আপনারা ডিলিমিটেশন চাইছেন? এই ভাবে দেশের গণতন্ত্রকে শেষ করে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে৷’ এ সময়ে শাহকে হাসতে দেখা যায়। প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীজি আমার কথা শুনে হাসছেন৷ উনি কিন্তু জানেন আমি সত্যি বলছি৷ আজ চাণক্য জীবিত থাকলে তিনিও চমকে উঠতেন৷’ প্রিয়াঙ্কার কথায় হেসে ওঠে গোটা সভাকক্ষ। ঘটনা হলো, বিজেপি–র অন্দরে শাহকে যে ‘চাণক্য’ বলে ডাকা হয়, সেটা রাজনৈতিক মহলে অজানা নয়। ফলে প্রিয়াঙ্কা ‘চাণক্য’ বলতেই হেসে ফেলেন অনেকে। যদিও এর জবাবে ট্রেজ়ারি বেঞ্চ থেকে পাল্টা কটাক্ষ ধেয়ে আসেনি।

    এ দিন বিল সংক্রান্ত আলোচনার শুরুতেই ডিএমকে সাংসদ সাংসদ টিআর বালু অভিযোগ করেন, ‘তিনটি বিল হলো স্যান্ডউইচ বিল৷ একটাকে অন্যর সঙ্গে সুকৌশলে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।’ কংগ্রেসের ডেপুটি লিডার গৌরব গগৈয়ের বক্তব্য, ‘মহিলা সংরক্ষণের নামে সরকার ডিলিমিটেশন বুলডোজ় করতে চাইছে।’ অখিলেশের প্রশ্ন, ‘মহিলা সংরক্ষণ বিলে মুসলিম মহিলাদের জন্য আলাদা কোটা রাখা হচ্ছে না কেন? তাঁদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা উচিত।’ এর জবাবে শাহ অবশ্য জানিয়ে দেন, ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণ সংবিধানসম্মত নয়।

    তৃণমূলের মুখ্য সচেতক কাকলি ঘোষ দস্তিদারের দাবি, ‘৫০ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুক সরকার৷’ তিনি বলেন, ‘তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে ৪১ শতাংশ মহিলাকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছেন৷ এত বেশি সংখ্যক মহিলা প্রতিনিধিত্ব আর কোনও দলের নেই। মোদী সরকারের এই আইন তো ছদ্মবেশী আইন। মহিলা সংরক্ষণের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় আঘাত হানার ছক।’

    এই পরিস্থিতিতে আজ, বিকেল চারটেয় তিনটি বিল নিয়ে ভোটাভুটি হবে। সব নজর আপাতত সে দিকেই।

  • Link to this news (এই সময়)