• মঞ্চে তিন তারকা, ত্রিমুখী লড়াইয়ের টানটান থ্রিলার উত্তর দমদমে
    এই সময় | ১৭ এপ্রিল ২০২৬
  • অশীন বিশ্বাস

    শহরের গা ঘেঁষেই রয়েছে কলকাতা আন্তজার্তিক বিমানবন্দর। অথচ সেখানকার পরিবেশ, মানুষের জীবনযাত্রার মান, নাগরিক পরিষেবা আজও ইস্যু দমদম উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে। তৃণমূল সার্বিক উন্নতির কথা বলে এখনও কিছু অসম্পূর্ণ কাজকে দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে যখন ভোট চাইছে, তখন বিরোধী বিজেপি এবং সিপিএম হেভিওয়েটের সংজ্ঞা হাতড়ে চলেছে। তাদের কটাক্ষ, হেভিওয়েট হয়ে তা হলে বিধায়ক–মন্ত্রী এতদিন করলেনটা কী?

    উত্তর দমদমে রাজ্যের হেভিওয়েট মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এ বারও তৃণমূলের প্রার্থী। তাঁর উল্টোদিকে বিজেপির প্রার্থী সৌরভ শিকদার দমদমের প্রাক্তন সাংসদ প্রয়াত তপন শিকদারের ভাইপো। সাংগঠনিক সূত্রে যিনি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনেরও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ৷ সিপিএম প্রার্থী করেছে তরুণ প্রজন্মের লড়াকু মুখ ছাত্রনেত্রী দীপ্সিতা ধরকে। ফলে লড়াই এখানে ত্রিমুখী শুধু নয়, সেয়ানে সেয়ানে।

    জমা জল থেকে পানীয় জল, খোলা নর্দমা, বেহাল রাস্তাঘাট ও নিকাশি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেহাল দশার সঙ্গে মশার উপদ্রব, স্থানীয় একাংশের নেতাদের দাদাগিরি, পুকুর ভরাট, বেআইনি নির্মাণ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ তুলে বিজেপি ও সিপিএম ভোট প্রচারে ছুটছে। আর তৃণমূল মনে করাচ্ছে ১৫ বছর আগে উত্তর দমদমের কী অবস্থা ছিল, আর এখন মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হয়েছে তা। সাংসদ তৃণমূলের, দুই পুরসভা উত্তর দমদম এবং নিউ ব্যারাকপুরও তৃণমূলের দখলে। ফলে শাসক শিবির প্রচারে এই বার্তাও দিচ্ছে ২০১৬–র যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়। ওই বছর সিপিএমের তন্ময় ভট্টাচার্য এই কেন্দ্র থেকে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন। শাসকের দাবি, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে গেলে তৃণমূলই বিকল্প।

    বিরাটি বিধান মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় প্রখর গরমকে উপেক্ষা করে ৭২ বছরের চন্দ্রিমা পায়ে হেঁটেই প্রচার চালাচ্ছিলেন। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। বাহাত্তরেও নাছোড়বান্দা বিদায়ী মন্ত্রী। বললেন, 'বিজেপি সব কিছুকে গ্রাস করতে চাইছে। যা গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ বারের লড়াই বাংলার সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই।' তৃণমূলের তরফে বিরাটি এমবি রোড সংস্কার থেকে মৃণালিনী দত্ত মহাবিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস চালু, উত্তর দমদম এবং নিউ ব্যারাকপুরের জন্য প্রায় ২০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দু'টি জল প্রকল্প–সহ উন্নত রাস্তাঘাট, নিকাশি, নিউ ব্যারাকপুর পুর হাসপাতালকে ঢেলে সাজার কথা তুলে ধরে প্রচার চলছে। সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ হওয়া সত্ত্বেও রেলের অনুমতি না মেলায় বিরাটি স্টেশন সংলগ্ন ফতেসা খাল সংস্কার করা যাচ্ছে না বলেও বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন চন্দ্রিমা।

    প্রয়াত তপন শিকদারের ছায়াকে সঙ্গী করে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি প্রার্থী সৌরভ শিকদার। কাকার চেনানো অলিগলি ঘুরে অনুন্নয়নের অভিযোগের সঙ্গে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে সামনে রেখে নিউ ব্যারাকপুর অঞ্চলে প্রচার চালাচ্ছিলেন সৌরভ। প্রচারে দিল্লি, মুম্বই বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকার উদাহরণ তুলে ধরে কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেন্দ্রিক মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সৌরভ। তাঁর অভিযোগ, সংলগ্ন এলাকার খোলা নর্দমা নিয়ে। খাল সংস্কার না হওয়ায় ঘরের মধ্যেই কয়েক মাস আগে জমা জলা পড়ে একরত্তির মৃত্যু প্রসঙ্গের সঙ্গে বিমানবন্দরে কাজের জন্য স্থানীয়দের অগ্রাধিকার না দেওয়ার অভিযোগও তুলছেন তিনি। সিপিএম প্রার্থীকে 'পলিটিক্যাল ট্যুরিস্ট' বলেও কটাক্ষ সৌরভের।

    নিমতা অঞ্চলে কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ এবং গলায় কাস্তে হাতুড়ি তারা আঁকা লকেট ঝুলিয়ে প্রচার সারছিলেন সিপিএমের দীপ্সিতা ধর। তিনি সার্বিক অনুন্নয়নের অভিযোগ তুলে ভোট প্রচারে স্টেডিয়াম, বিরাটি স্টেশনে আন্ডারপাস–সহ একগুচ্ছ পরিকল্পনার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। প্রচারের মধ্যেই শিশু দেখলেই ঝোলা ব্যাগ থেকে লজেন্স বের করে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন জেএনইউয়ের প্রাক্তনী। তাঁর কথায়, 'লড়াইটা তৃণমূল কিংবা বিজেপির বিরুদ্ধে যত না, তার চেয়ে বেশি দেশ এবং রাজ্য কোন পথে চলবে তার। যেখানে ধর্ম নয়, প্রাধান্য পাবে মানুষের রুটি রুজি ও বেঁচে থাকার লড়াই। সেই লড়াই একমাত্র বামপন্থীরাই লড়ছে।'

    প্রচারের বাইরে কী করে নিজের পক্ষে ভোট টানা যায় সেই স্ট্র্যাটেজি নিয়েও তিন পক্ষ কাটাছেঁড়া শুরু করেছে। কারণ হিসেব বলছে ২০২১–এর থেকে ২০২৪ সালের নিরিখে এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট বেড়েছে ১৩ হাজারের একটু বেশি। শাসকের ঘাড়ের কাছে তারা নিঃশ্বাস ফেলছে। সিপিএমেরও এই কেন্দ্রে নিজস্ব ভোট ব্যাঙ্ক রয়েছে। ফলে ত্রিমুখী লড়াইয়ে টানটান থ্রিলারের যবনিকা উঠবে আগামী ৪ মে।

  • Link to this news (এই সময়)