সুমন ঘোষ, খড়্গপুর
একশো দিনের কাজের প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় কেবলমাত্র যে গরিব দিনমজুররা বিপাকে পড়েছেন তা নয়, বিপাকে পড়েছেন শিল্পীরাও। কারণ, তাঁদেরও কাজ হারাতে হয়েছে। কী কাজ? একশো দিনের প্রকল্পের যে কোনও কাজে ফলক বানাতে হয়। ফলকে লিখতে হয় কাজের নাম, কাজের ধরন, বরাদ্দ প্রভৃতি। প্রকল্পে টাকা না মেলায় কাজও বন্ধ। ফলে, ফুরিয়েছে ফলক লেখার প্রয়োজনও। তাতেই কাজ হারিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন শিল্পীরা। তবে ব্যানার, ফেস্টুন, হোর্ডিংয়ের যুগেও ভোটে এখনও দেওয়াল লেখার আকর্ষণ থেকে যাওয়ায় কিছুটা হলেও অক্সিজেন পেয়েছেন শিল্পীরা। ভোটে দেওয়াল লেখার বরাত মেলায় হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন শিল্পীরা।
ভোটের দেওয়াল লিখনের মজা একটু অন্যরকম। এক রাজনৈতিক দল অন্য রাজনৈতিক দলকে ব্যঙ্গ করে ছড়া লেখে, কার্টুন বানায়। পথচলতি লোকজন সে সব দেখেন, পড়েন। অন্য একটি মজাও আছে। এক শিল্পী পদ্মফুল আঁকছিলেন একটি দেওয়ালে। কিছুক্ষণ পরে সেই শিল্পীকেই অন্য দেওয়ালে তন্ময় হয়ে ঘাসের উপরে জোড়াফুল বা কাস্তে–হাতুড়ি–তারা আঁকতে দেখা যায়! তিনি এক দেওয়ালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আক্রমণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘যদি তুই দুষ্টু লোক/তোর দাড়িতে উকুন হোক।’ তিনিই আবার অন্য দেওয়ালে লিখছেন, ‘যতই নাড়ো কলকাঠি /নবান্নে যাবে হাওয়াই চটি।’ আবার তিনিই লিখছেন, ‘জ্যোতি খেল চাল–গম, শিক্ষা খেল পার্থ/ কেষ্ট খেল গোরু–বাছুর মানিক খেল অর্থ/ নেতামন্ত্রী ভাগ করে খায় আমরা দেখি রঙ্গ/ পিসি–ভাইপো গিলে খেল গোটা পশ্চিমবঙ্গ।’
২৬ বছর ধরে লেওয়াল লিখনের সঙ্গে যুক্ত সবং ব্লকের গোড়া গ্রামের গোপাল জানা। দেওয়াল লিখনের পাশাপাশি একশো দিনের প্রকল্পের ফলক লেখা ও অন্য ক্ষেত্রে লেখায় হাত পাকিয়েছেন। গোপাল জানান, তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম সকলেই তাঁকে দেওয়াল লেখার বরাত দেন। কিন্তু একই সঙ্গে পদ্মফুল এঁকে জোড়াফুল আঁকতে গিয়ে হোঁচট খান না? হাসতে হাসতে গোপাল বলছেন, ‘না, অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। শুধু প্রতীক কেন, বেশিরভাগ ছড়াও আমরা নিজেরাই লিখে দিই। এত দিন ধরে লিখছি তো। যদি কোনও দল নতুন কিছু ছড়া বানিয়ে দেয়, তখন সেগুলো লিখি। না হলে আমাদের মতোই কাজ করে বেরিয়ে যাই।’ নির্বাচনের সময়ে দিনে অন্তত তিন হাজার টাকা উপার্জন হয় দেওয়াল লিখে। তবু আফসোস করছেন শিল্পীরা। কেন? তাঁরা জানাচ্ছেন, ভোট তো আসে পাঁচ বছরে একবার। প্রধান উপার্জন হয়ে দাঁড়িয়েছিল একশো দিনের কাজের প্রকল্পের ফলক লেখা। প্রতিদিন একাধিক কাজের বরাত মিলত। এখন তো সেটাই নেই। ফলে বছরভর যে রোজগার হতো, সেটা কমেছে।
একশো দিনের প্রকল্পের কাজে ফলক লাগানো ছিল বাধ্যতামূলক। ফলকে লিখতে হতো, প্রকল্পের নাম, স্থান, কাজের ধরন, বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ, অনুমোদিত কর্মদিবস, গ্রাম পঞ্চায়েত বা ব্লকের নাম। জেলার ২১টি ব্লকের ২১১টি গ্রাম পঞ্চায়েতে এই কাজ চলত। সেটাই ছিল একাধিক শিল্পীর রুজিরুটি। তবে নির্বাচন আসায় পালে কিছুটা হাওয়া লাগায় খুশি গোপালের মতো শিল্পীরা।