অলস দুপুর। বটতলায় বসে বিড়ি টানছেন বৃদ্ধ রহিম। ভোটের দু’দিন আগেও তালিকায় নাম জুড়তে পারে জানেন এ কথা? প্রশ্ন শুনে ধোঁয়া ছেড়ে বলেন, “নাম বাদ গিয়েছে, ভাইপো এসে বলেছিল। ওঁর সঙ্গে গিয়ে কম্পিউটারে আবেদন করেছি। আমার কাছে ইংরেজিতে লেখা একটা কাগজ রয়েছে। বাকি জানি না।” এরপরই দৃঢ় কণ্ঠে রহিম বলে ওঠেন, “এখানেই বেড়ে ওঠা। সব কাগজ আছে। আমার নামটা কেটে দিল?”
‘বাতিল’ ভোটারের জন্য গঠিত হয়েছে ট্রাইব্যুনাল। নাম তুলছেন বিচারপতিরা। সুপ্রিম নির্দেশে দু’দিন আগে পর্যন্ত যাঁদের নাম উঠবে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। আবেদনের সংখ্যা ২৭ লক্ষের বেশি। প্রথম দফার ভোটের বাকি সাতদিন। দ্বিতীয় দফার বাকি ১২ দিন। মাত্র এই কয় দিনে কত জনের নাম উঠবে? তাছাড়া ২১ তারিখ নাম উঠলেও সাপ্লিমেন্টারি তালিকা কখন বেরবে? একদিনের ব্যবধানে প্রত্যন্ত গ্রামে ভোটার স্লিপ পৌঁছবে কী করে? যেখানে ভোটকর্মীদের যেতে বেগ পেতে হয় সেই অঞ্চলের ভোটার জানবেন কী করে তাঁর নাম উঠছে। পুরো বিষয়টি ‘প্রতীকী’ হবে না তো! সব নিয়ে শঙ্কিত ভোটাররা।
ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া আবেদনের নিষ্পত্তি নিয়ে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ২১ ও ২৭ এপ্রিল (প্রথম দফার ভোট ২৩ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফার ভোট ২৯ এপ্রিল) পর্যন্ত যত ভোটারকে ট্রাইব্যুনাল ‘যোগ্য’ মনে করবে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। এমনটাই নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের। এবার প্রশ্ন মাত্র এই ক’দিনে কত ভোটারের নামের নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে?
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কলকাতা হাই কোর্টের তত্ত্বাবধানে ‘বিচারাধীন’ তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ভোটারদের জন্য তৈরি হয়েছে ট্রাইব্যুনাল। রাজ্যের ২৩টি জেলার জন্য ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। ১২ এপ্রিল থেকে কাজ চলছে কলকাতায়। ‘ডিলিটেড’ ভোটাররা আবেদন করেছেন। তা খতিয়ে দেখছেন প্রাক্তন বিচারপতিরা।
‘বিচারাধীন’ তালিকা ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম বাদ পড়েছে। ট্রাইব্যুনালে আবেদন জমা পড়েছে ৩৪ লক্ষ ৩৫ হাজার ১৭৮টি। অর্থাৎ ‘রিভাইসড ইলেক্টোরাল রোলে’ নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের একাংশও আবেদন জানিয়েছেন। এবার ১৯ জন প্রাক্তন বিচারপতি এই ক’দিনে কত ভোটারের নামের নিষ্পত্তি করতে পারবেন সেটাই মূল প্রশ্ন।
ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ জুরিডিকাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক সারফরাজ আহমেদ খান ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র ‘দ্য টেলিগ্রাফ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “সব কিছুই নির্ভর করছে ট্রাইবুন্যালের উপর। ১৯টি ট্রাইব্যুনালের সবগুলোই পুরোদমে কাজ করছে কি না, কারও জানা নেই। বিচারপতিরা যদি দিনে ১০০টি মামলারও নিষ্পত্তি করেন সেক্ষেত্রে, প্রথম পর্বের আগে মাত্র ৯,৫০০টি এবং দ্বিতীয় পর্বের আগে ২০,০০০-এরও কম মামলার নিষ্পত্তি করা সম্ভব।”
তাঁর আরও মতামত সুপ্রিম কোর্ট আরও কিছু বিষয় নির্দিষ্ট করে দিতে পারত। আইনের অধ্যাপক বলেন, “২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম আছে বা পাসপোর্ট থাকা ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হলেও ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল। এতে ট্রাইব্যুনালগুলোর উপর চাপও কমত।”
নাম বাদ গিয়েছে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউটাউন ক্যাম্পাসের শিক্ষিকা মেলিশা খাতুনের। তিনি বলেন, “৭ এপ্রিল সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় আমার নাম বাদ যায়। আমি ১২ এপ্রিল অনলাইনে আবেদন করেছি। আমার আগে নিশ্চয়ই লক্ষ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। যদি আবেদনের সময় অনুযায়ী মামলার নিষ্পত্তি হয়, তাহলে মনে হয় না আমার নাম তালিকায় জুড়বে।” আইআইএম ক্যালকাটার শিক্ষিকা নন্দিতা রায়েরও নাম বাদ গিয়েছে বিচারাধীন তালিকা থেকে। তিনি অফলাইনে আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও রেফারেন্স নম্বর পাননি বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করছি সময়মতো আমার নাম নিষ্পত্তি হবে। তালিকায় নাম উঠবে।”
রেফারেন্স নম্বর, ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ। কিছু বোঝেন না বটতলায় বসা রহিম। জন্মসূত্রে ভারতীয় হওয়ার পরও ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। বিড়ির ধোঁয়ার কুণ্ডলী ফিকে হতে হতে মিশে যায় বাতাসে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন রহিম!