অগ্নিভ ভৌমিক, কালীগঞ্জ: মীরাবাজার পেরিয়ে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে বাঁদিকে গেলেজানকিনগর। কিছুটা এগিয়ে গেলেই ঐতিহাসিক পলাশি মনুমেন্ট। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সাজিয়ে তোলার কথা থাকলেও, তা এখন বিশবাঁও জলে। ফলে, কর্মসংস্থানের যে প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত ফাইলবন্দি।কালীগঞ্জের বিধানসভায় রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর মধ্যে অন্যতম হল এটি। পলাশির এই প্রান্তর বাংলার রাজনীতির ইতিহাসকে বয়ে নিয়ে চলে। এখনও বাংলার স্বাধীন নবাবের সঙ্গে ব্রিটিশদের লড়াইয়ের আবেগ নিয়ে বাঁচে এখানকার মানুষজন।
বাংলার ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখার সেই আবেগ এখন এসআইআয়ের সৌজন্যে ক্ষোভে পরিণত। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই বিধানসভায় ১৫ হাজার ৬০০ ভোটার বিচারাধীন ছিলেন। বাদ পড়েছেন ১২ হাজারেরও বেশি ভোটার! ভবিষ্যতের কথা ভেবে আতঙ্কে রয়েছেন সকলেই। আর মনস্তত্ত্ব বলে, ভয় থাকলেই এককাট্টা হওয়ার তাগিদ চলে আসে স্বাভাবিকভাবেই। এখানেও তাই হয়েছে। সংখ্যালঘুরা নিঃশর্ত জোটবদ্ধ। দেবগ্রাম স্টেশনের কাছে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন মইদুল ইসলাম। তিনি বলছিলেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগেই এরকম করছে। ক্ষমতায় এলে কী করবে, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে নোংরামি করছে। এই সংকটকালে একমাত্র তৃণমূলই আমাদের বাঁচাতে পারে।’
কালীগঞ্জে দীর্ঘ সময় বাম-কংগ্রেস যুযুধান প্রতিপক্ষ ছিল। ২০১৬ সালেও এই কেন্দ্রে তৃণমূলকে হারিয়ে কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল। বামের ভোট রামে যেতেই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভাতেই দ্বিতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপি। শক্ত ঘাঁটি কালীগঞ্জে গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৪৬ হাজার এবং গত লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ৩৩ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। আট মাস আগে উপনির্বাচনে তৃণমূলের প্রয়াত বিধায়ক নাসিরউদ্দিন আহমেদের মেয়ে আলিফা আহমেদ প্রায় ৫০ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। ছাব্বিশেও সেই জয়ের ধরাই বজায় রাখতে চাইছে ঘাসফুল শিবির। উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে আসার পর ব্লক সংগঠন ও নেতৃত্বের সঙ্গে বিধায়ক আলিফা আহমেদের সম্পর্কে আড়াআড়ি ফাটল দেখা গিয়েছিল। এখন অবশ্য গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সেই চোরাস্রোত সেভাবে চোখে পড়ে না। তার সঙ্গে অনুঘটকের কাজ করছে, সংখ্যালঘুদের এককাট্টা মনোভাব আর এলাকার সার্বিক উন্নয়ন।
উপনির্বাচনে নির্বাচনি ফলাফলের দিন তৃণমূলের বোমারআঘাতে মৃত্যু হয়েছিল ছোট্ট তামান্না খাতুনের। সেই তামান্নার মা’কেই সিপিএম কালীগঞ্জ থেকে প্রার্থী করেছে। শুরু থেকেই চুটিয়ে প্রচার করছেন তিনি। অন্যদিকে, কালীগঞ্জ বিধানসভায় হুমায়ূন কবিরের দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কে কতটা থাবা বসাবে, সেই দিকে পাখির চোখ বিজেপির।
তৃণমূল প্রার্থী আলিফা আহমেদ বলছিলেন, ‘বিজেপি মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ভোট দিতে পারছেন না। মানুষ এর বদলা ইভিএমে নিতে প্রস্তুত। আমাদের দল মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার চালিয়ে যাচ্ছে।’
কালীগঞ্জের সিপিএম নেতা দেবাশীষ আচার্য বলেন, ‘মানুষ তৃণমূল ও বিজেপির অত্যাচার অতিষ্ঠ। তৃণমূলের অনেক গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আছে। মানুষ এবার বিকল্প হিসেবে সিপিএমকেই বেছে নেবে। কারণ তৃণমূল যাঁকে প্রার্থী করেছে, তাঁর উপনির্বাচনের ফলাফলের দিন তামান্না খাতুন তৃণমূল বোমার আঘাতে খুন হয়েছিল। এর জবাব মানুষ নেবে।’বিজেপি নেতা সন্দীপ মজুমদার বলেন, ‘বাংলার মানুষ পরিবর্তন চাইছেন।কালীগঞ্জেও সেই পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।’