বলাগড়: মিশুকে রঞ্জন ও ‘তিনমূর্তি’র ঐক্যতানে তৃণমূলের জয়ধ্বনি
বর্তমান | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: নাম থেকে ধাম, সবেতেই বিভ্রান্ত করে বলাগড়। নামে গড় আছে। মনে হবে অতীতে দুর্গ-টুর্গ ছিল। আসলে, গড় মানে জলাশয়, পরিখা। জল আর বালুর চর মিলিয়ে বালু-গড়, অপভ্রংশে বলাগড়। আবার ধামেও গণ্ডগোল। ওটি যে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অংশ, তা সমৃদ্ধ জনপদ দেখে বোঝা ভার। এই জনপদে ভোট মানেই বিভ্রান্তি।
এমনধারা জনপদে বিভ্রান্তির জট ছাড়াতে ‘তিনমূর্তি’র নাকি জুড়ি নেই। তিন তৃণমূলী বললে সহজ হয়। শ্যামা-অসীম-নবীন। শ্যামা অর্থাৎ শ্যামপ্রসাদ রায় বন্দ্যোপাধ্যায় বলাগড়ে তৃণমূল রাজনীতির ‘সিধুজ্যাঠা’। অসীম অর্থাৎ প্রাক্তন বিধায়ক অসীম মাঝি। আর নবীন গঙ্গোপাধ্যায় হলেন প্রাক্তন ব্লক সভাপতি। এবার জুড়েছে আরও এক মূর্তি, রঞ্জন ধাড়া। তিনি হুগলি জেলা পরিষদের সভাধিপতি, বলাগড়ের তৃণমূল প্রার্থী। মজার মানুষ, তাঁর মধ্যে অহংকারের ছিঁটেফোঁটা নেই। উদ্দেশ্য বা বিধেয়, কিংবা কৌশল শব্দের সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেই। সহজে মিশে যেতে তাঁর জুড়ি নেই। ফলে, তিনমূর্তির সঙ্গে তিনি এমনভাবে মিশে গিয়েছেন যেন, হরিহর-আত্মা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ওখানেই বলাগড় বিধানসভার কেল্লা অনেকটাই মেরে দিয়েছেন রঞ্জন।
ব্যাপারটা ঠাহর করা গেল খামারগাছিতে। স্থানীয় ব্যবসায়ীর দোকানে ছোটো জটলা। মালিক মলয় সরকার বলছিলেন, রঞ্জন ধাড়া লোকটি মাটির মানুষ। নাক উঁচু বিধায়ক হলেই বিপদ। তখন তাঁর সঙ্গে সহজে কথা বলা যায় না। উপস্থিত সকলেই তাঁর সঙ্গে একমত। আরেকটু যাচাই করতে বহুদূরের মীরডাঙা কলোনিতে এক কৃষককে ধরা গেল। নাসির শেখ ভরদুপুরে দেদার ঘামছেন। বললেন, বামপ্রার্থী ভালো। কিন্তু রঞ্জন ধাড়া খুবই ভালো। যেন, পাশের বাড়ির মানুষ। সব কথা বলা যায়। আরেকজনের মতো জমিদারি চাল নেই। নাসিরের ওই আরেকজন হলেন বিজেপি প্রার্থী সুমনা সরকার। এমনিতেই তিনি পাকচক্রের মানুষ। একদা ঘাসফুলে ছিলেন। এখনও সেই দাপট নাকি সর্বদা প্রকাশ পায়। তাতে কর্মীদেরই মুখ ভার।
এবার এসআইআর নিয়ে বিপদ হয়েছে। গুপ্তিপাড়া থেকে জিরাট, বিস্তীর্ণ এলাকায় জনরোষ গ্রীষ্মের দুপুরের থেকেও চড়া। তাতে পদ্ম-পাপড়ি রীতিমতো কুঁকড়ে যেতে বসেছে। সঙ্গে আছে বলাগড়ের ঐতিহাসিক ভাঙন। বছর দুয়েক আগেও এখানে সাংসদ ছিল বিজেপির। অভিযোগ, ভাঙন নিয়ে তিনি কিছুই করেননি। পদ্মপার্টির কপালের ফের, তৃণমূলের অভিনেত্রী সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২৪ সালে ভোটে জিতে সংসদে গিয়ে প্রথম বক্তব্যই রেখেছিলেন ভাঙন নিয়ে। ব্যাস, বিপাকের ষোলোকলা পূর্ণ। কিন্তু সুমনা বলছেন, গঙ্গাকে ঘিরে মোদিজি বলাগড়ে বন্দর গড়বেন। তখন বলাগড়ের চেহারা বদলে যাবে। আমি সবার সঙ্গে মিশি। অপপ্রচারে সুবিধা হবে না। সোমড়াতে পরিচয় হয়েছিল এক পদ্ম-কর্মীর সঙ্গে। নাম বলতে চাননি। দাঁতে দাঁত পিষে বলেছিলেন, তৃণমূলের সুমনার মার এখনও পিঠে ট্যাটু হয়ে আছে। তাহলে ভোট? পদ্মপার্টির কর্মী আরেকদফা দন্তবাদ্য করেছিলেন শুধু। বলাগড়ের সিপিএম প্রার্থী বিকাশ গোলদার সহজ মানুষ। বলেন, আমাদের ভোট ফিরছে। তাই এবার জয়ের কথা ভাবা যাচ্ছে। আর রঞ্জন বলেন, মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিচ্ছেন, তাতেই ভোটের ফলাফল স্পষ্ট।
সত্যের খোঁজ করতে গিয়ে দেখা হল শ্যামা-অসীমের সঙ্গে। অসীমের দাবি, বলাগড় জিতবই। আর ঘাসফুলের প্রতি আনুগত্য থাকলেও ঠোঁটকাটা সিধুজ্যাঠা অর্থাৎ শ্যামা বললেন, ভোটের বলাগড়ে ‘গড়’ মানে দূর্গই। তৃণমূলের দূর্গ, রঞ্জনের দূর্গ। বলাগড়ের এক গ্রাম্য গৃহবধূ তখন তুলসী তলায় পিদিম জ্বেলে শঙ্খধ্বনি দিলেন। মনে পড়ল শাস্ত্র বলে, শঙ্খ বাদ্যে জয় আর দন্ত বাদ্যে....।