• আয়কর হানা মমতার প্রস্তাবকের বাড়িতে, তল্লাশির মুখে দেবাশিস কুমার, আক্রমণে তৃণমূল
    এই সময় | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: ভোটের মুখে ‘মধ্যরাতে অভিযান’–এর প্রসঙ্গ তুলে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ও নির্বাচন কমিশনকে গত ক’দিন ধরেই নিশানা করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকী, যদি দলীয় বুথ এজেন্টদের এজেন্সি গ্রেপ্তার করে, তা হলে ‘প্যারালাল এজেন্ট’ তৈরি রাখার পরামর্শ বৃহস্পতিবারই দিয়েছিলেন তৃণমূলনেত্রী। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কলকাতায় আয়কর হানার মুখে পড়লেন রাসবিহারী কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস কুমার এবং ভবানীপুর কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী–পদে অন্যতম নাম প্রস্তাবক মিরাজ ডি শাহ। আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়ে এর আগেও তল্লাশির মুখে পড়েছিলেন তিনি। গত ৮ এপ্রিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মনোন‍য়ন পেশ করতে যাওয়ার সময়ে তাঁর সঙ্গেই ছিলেন ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটির ভাইস চেয়ারম্যান মিরাজ।

    ফলে তাঁর বাড়িতে এ দিন আয়কর হানার বিষয়টিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। জমি সংক্রান্ত প্রতারণার একটি মামলায় কিছুদিন আগে দেবাশিস কুমারকে তলব করেছিল আর এক কেন্দ্রীয় এজেন্সি ইডি। ফলে তাঁর বাড়ি ও নির্বাচনী কার্যালয়ে আয়কর তল্লাশির বিষয়টিও যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী। ঠিক কোন কারণে এ দিন আয়কর বিভাগের এই অভিযান, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনও মন্তব্য করেননি। তবে ভোটের আগে এই অভিযান নিয়ে এ দিন তৃণমূলনেত্রী মমতা আরও সুর চড়িয়েছেন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। দমদমের সভা থেকে সরাসরি কারও নাম না–করে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রার্থীর বাড়িতে আয়কর হানা দিয়েছে। ও আমাদের প্রার্থী। ওকে আটকে রাখলে প্রচার করবে কখন? এখন আটকে রাখা মানে তার একটা গোটা দিন নষ্ট। ইডি, সিবিআই, আইটি সবাই তল্লাশি চালাচ্ছে। বিজেপির সরাসরি লড়াইয়ের হিম্মত নেই। ভোটে লড়া তো সাংবিধানিক অধিকার। আটকে রেখে তার অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। আমি আইনি পদক্ষেপ করব যতটা সম্ভব।’ যদিও এই অভিযানের মধ্যে রাজনৈতিক কোনও কারণ আছে বলে মনে করছেন না বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘কেন অভিযান, আমি কী ভাবে বলব? আয়কর দপ্তর বলতে পারবে। অবৈধ টাকা থাকলে হবে। এটা নতুন কিছু নয়।’

    শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ দেবাশিস কুমারের মনোহরপুকুর রোডের বাড়ি, তাঁর কেন্দ্রীয় নির্বাচনী কার্যালয় ও কাউন্সিলার অফিসের সামনে পৌঁছে যায় আয়কর দপ্তরের টিম। এলাকা ঘিরে ফেলে কেন্দ্রীয় বাহিনী। দেবাশিসের বাড়ি থেকে দেড়শো মিটার দূরেই রয়েছে ওই নির্বাচনী কার্যালয়। সকাল সাড়ে ৭টার পরে ওই কার্যালয়ের তালা খোলা হয়। দীর্ঘ প্রায় ১৫ ঘণ্টা ধরে চলে তল্লাশি। আয়কর অভিযান চলাকালীন‍ তৃণমূলের স্থানীয় কয়েকজন কর্মী–সমর্থক মুখে দেবাশিসের ছবি দেওয়া মুখোশ লাগিয়ে বিক্ষোভও দেখান। এ দিন দুপুরে দেবাশিসের কিছু নথি নিয়ে কমিশনের অফিসে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর এক প্রতিনিধির। সেই মতো ওই প্রতিনিধি দেবাশিসের বাড়িতে গেলে তাঁকেও কেন্দ্রীয় বাহিনী দীর্ঘক্ষণ ভিতরে ঢুকতে দেয়নি বলে অভিযোগ। যদিও ঘণ্টা খানেক বাদে তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হয় ওই বাড়িতে। দেবাশিসের বাড়ি থেকে সন্ধ্যা সওয়া ৬টা নাগাদ দুই আয়কর আধিকারিক বের হন। ভোটের আগে দেবাশিস কুমারকে হেনস্থার বিষয়ে এক আয়কর আধিকারিক বলেন, ‘হেনস্থা কেন করা হবে? তদন্তের ভিত্তিতে কিছু বিষয়ে জানার ছিল। তাই আমরা এসেছি।’ রাত সওয়া ৮টা নাগাদ দেবাশিসের বাড়ি থেকে আয়কর আধিকারিকদের গোটা টিম বের হয়। দেবাশিস পরে বলেন, ‘এতে আমার মার্জিন বাড়ল। কেউ কেউ খুব ভয় পেয়েছে। ৩৬৫ দিন আমি মানুষের সঙ্গে থাকি। আমাকে এক–দু’দিন আটকে ভোটের রাজনীতি করতে পারবে না।’ এর পাশাপাশি কালীঘাটেও কুমার সাহা নামে এক তৃণমূল নেতার বাড়িতে তল্লাশি চালায় আয়কর দপ্তর।

    সকালে মিরাজের এলগিন রোডের বাড়িতেও প্রায় একই সময়ে পৌঁছে যান আয়কর বিভাগের অফিসাররা। কিছুদিন আগে মমতা নিজেই অভিযোগ করেছিলেন, ভুয়ো হলফনামা জমা দিয়ে তাঁর মনোনয়ন বানচালের চেষ্টা করেছিল বিজেপি। তার মধ্যেই তাঁর অন্যতম নাম প্রস্তাবকের বাড়িতে তল্লাশি নিয়ে জল্পনা ছড়িয়েছে। তল্লাশি চলাকালীন মিরাজের পিএসও চিরঞ্জীব দত্ত ব‍লেন, ‘উনি পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং আইনজীবী। ১৯৪১ থেকে এই বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকেন। সকাল ১০টা নাগাদ জনা দশেক আয়কর অফিসার এসে অভিযান শুরু করেন। এর আগে ২০২২–এও একবার অভিযান হয়েছিল।’

    এই প্রসঙ্গে এ দিন এক্স হ্যান্ডলে শুভেন্দুর একটি পুরোনো পোস্ট এই প্রসঙ্গে সামনে এসেছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি ওই পোস্টে শুভেন্দু দাবি করেন, ‘প্রভাবশালী’ মিরাজ দিগ্বিজয় শাহের মামলায় আয়কর হানায় বাজেয়াপ্ত ১৯.০১ কেজি ওজনের ২৪ এবং ২২ ক্যারাট সোনার বার, কয়েন ও টুকরো এবং ৩.৩ কেজি সোনার গয়না নিয়ে বড় নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। পোস্টে তিনি এও লিখেছিলেন, ‘মাননীয় আদালতের স্পষ্ট রায় — আয়কর কর্তৃপক্ষের এই বিপুল সম্পত্তি খতিয়ে দেখার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এমনকী, এর জন্য কারণ জানানোরও কোনও প্রয়োজন নেই! ...ফাঁস ক্রমশই শক্ত হচ্ছে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এবং নজর রাখছে গোটা বাংলা...।’ এ দিনের তল্লাশি সেই সংক্রান্ত বিষয়েই কি না, তা নিয়ে অবশ্য কোনও মন্তব্য করেনি আয়কর বিভাগ।

    এ দিন কেন্দ্রীয় এজেন্সি ও মোদী সরকারকে বিঁধে মমতা বলেন, ‘যদি তল্লাশির দরকার হয়, ভোটের পরে করো। এখন কেন?’ ফের সরাসরি কারও নাম না–করে তাঁর সংযোজন, ‘একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট যাঁরা আমাদের হিসেব দেখেন, তিনি অন্য অনেকেরই হিসেব দেখেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের তো কোনও যোগ নেই। সেই তল্লাশিও ভোটের মধ্যে করতে হলো! একটুও লজ্জা নেই, একটুও ভয় নেই। এ বার হিসেব জনতা বুঝে নেবে।’ এর আগে কোচবিহারের সভা থেকে বিজেপির উদ্দেশে তাঁর আক্রমণ, ‘কালো টাকার হুন্ডি নিয়ে বাংলায় বসে আছে। আর আমার প্রার্থীর বাড়ি, পার্টি অফিসে তল্লাশি করছে। আমার বিমানেও তল্লাশি করতে গিয়েছিল। নির্লজ্জ, বেহায়া, সামনাসামনি লড়াই করতে পারে না। ভীতু, কাপুরুষ।’ এর জবাব মানুষ ভোট বাক্সে দেবে বলেও জানান মমতা। পাল্টা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘তৃণমূল আর দুর্নীতি সমার্থক শব্দ। যদি কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সি রেইড করে, তা হলে তো সেটা স্বাভাবিক ভাবেই তৃণমূলের কোনও নেতার বাড়িতেই হবে। তৃণমূল এর সঙ্গে অভ্যস্ত। মানুষও জানেন, তৃণমূল দুর্নীতিগ্রস্ত। ফলে আমরা এ নিয়ে ভাবিত নই।’

  • Link to this news (এই সময়)