• বিরোধী ঐক্যে জয় লোকসভায়, ‘হাওয়া ঘুরছে দিল্লিতে’, বার্তা অভিষেকের
    এই সময় | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: এই মুহূর্তে গোটা দেশের নজর রয়েছে বাংলায় বিধানসভা ভোটের দিকে। পরিবর্তন বনাম প্রত্যাবর্তনের এই লড়াইয়ে রাজ্যের শাসকদলের হয়ে টানা নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্যস্ত জোড়াফুলের সাংসদরাও। ফলে লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত তিনটি সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে ভোটাভুটির ক্ষেত্রে তৃণমূলের সাংসদদের অবস্থান ঠিক কী হবে, তা নিয়ে জল্পনা চলছিল রাজধানীর রাজনৈতিক অন্দরমহলে। কিন্তু এই অবস্থাতেও গত ১২ বছরের মধ্যে এই প্রথমবার অঙ্কের নিরিখে সংসদে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিল তৃণমূ‍লই।

    জোড়াফুলের লোকসভার দলনেতা অভিষেক নিজে বাংলায় ভোটের প্রচারে ব্যস্ত থাকলেও এক্ষেত্রে তাঁর রণকৌশল অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছে বলে মত নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। সূত্রের দাবি, সম্ভবত সেই কারণেই এ দিন সংসদে ভোটাভুটির পরে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী নিজে ফোন করেন অভিষেককে এবং বিরোধী শিবিরের এই সাফল্যের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান। আবার কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভায় কংগ্রেসের দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে সংসদের ফ্লোর কোঅর্ডিনেশনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনকে। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্যতম শরিক সমাজবাদী পার্টির সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব আবার ফোন করেন‍ তৃণমূলনেত্রী মমতাকে। সব মিলিয়ে এ দিন রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে একরকম জোড়াফুলের জয়জয়কার।

    রাতে এক্স হ্যান্ডলে অভিষেক লেখেন, ‘লোকসভায় ডিলিমিটেশন বিল পাশের ব্যর্থতা বিজেপির অস্বস্তিকে একেবারে প্রকাশ্যে এনে ফেলেছে। মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ সুনিশ্চিত করতে মহিলা সংরক্ষণ আইনটি ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। ২০২৩–এর সেপ্টেম্বরে সর্বসম্মতিক্রমে এই বিলটি পাশ হয়েছিল। এনডিএ সরকার যদি এই বিষয়ে সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত করে অবিলম্বে তাদের বিল আনা উচিত। এই কাজ এখনই করা হোক!’ তাঁর সংযোজন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস শুধু নীতিগতভাবেই এই বিষয়টিকে সমর্থন করেনি, বাস্তবে তাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। সংসদে তাদের মহিলা সাংসদের প্রতিনিধিত্ব ৪১ শতাংশেরও বেশি। সংবিধানের ১৩১ তম সংশোধনী বিল ইতিমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছে ইন্ডিয়া জোট। ২০১১–এর জনসুমারির ভিত্তিতে ডিলিমিটেশনের মাধ্যমে লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার যে চেষ্টা হয়েছিল, তা রাজনৈতিক স্বচ্ছতা এবং ভারসাম্য নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।’ এরপরে মোদী সরকারকে নিশানা করে তাঁর কটাক্ষ, ‘এটা একেবারে স্পষ্ট যে, এনডিএ সরকার এখন ধার করা সময়ে চলছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম থাকার যে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা এখন সবার চোখের সামনেই ভেঙে চুরমার হতে শুরু করেছে!’

    সূত্রের দাবি, এ দিন সন্ধেয় রাহুল নিজেই অভিষেককে ফোন করে রাজনৈতিক ভাবে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তৃণমূল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে বলে ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে বাংলায় বিধানসভা ভোট চলাকালীন তৃণমূল নেতৃত্ব তাঁদের ২১ জন সাংসদকে ভোটাভুটিতে পাঠানোয় রাহুল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিরোধী শিবির সূত্রে এও জানা গিয়েছে, অভিষেক পাল্টা রাহুলকে বলেন, ‘জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে হাওয়া ঘুরছে।’

    কী ভাবে সংসদে বিরোধীদের একসূত্রে বেঁধে কিস্তিমাত করলেন অভিষেক?

    জোড়াফুল সূত্রের খবর, নির্বাচনী প্রচারে এখন প্রায় প্রতিদিনই সকাল–বিকেল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। আবার বাংলায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনে (সার) ‘অ্যাজুডিকেশনে’র মাধ্যমে যত মানুষের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের মধ্যে কতজন ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাচ্ছেন, তারও নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন অভিষেক। এর মধ্যেই দলীয় সাংসদদের নিয়ে তিনি একাধিকবার বৈঠক করেছিলেন। তাঁরই পরামর্শে বাংলায় ভোটপ্রচারের ব্যস্ততার মধ্যেও তৃণমূলের ২১ সাংসদ উপস্থিত ছিলেন লোকসভায়। এমনকী, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা কাকলি ঘোষ দস্তিদার–সহ তৃণমূলের বক্তারা বিল নিয়ে আলোচনার সময়ে কে কোন পয়েন্টে কেন্দ্রকে বিঁধবেন, সেটাও ছকে ফেলা হয়েছিল ওই বৈঠকগুলিতে। সূত্রের খবর, শুক্রবার সকালে তৃণমূল নেতৃত্ব ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের অন্য দলগুলিকে জানিয়ে দেয় যে, এ দিন ভোটাভুটি হলেও এককাট্টা বিরোধী শিবির ভালো রেজ়াল্ট করবে। বস্তুত, বৃহস্পতিবার কাকলি এবং এ দিন কল্যাণ লোকসভায় আলোচনা চলাকালীন যে ভাষণ দেন, সেখানেও পরিকল্পনামাফিক রণকৌশল সাজানোর ছাপ রয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। কাকলি সংসদে দাবি করেছিলেন, ডিলিমিটেশন বিল কোনও ভাবেই সংসদে পাশ করতে দেবে না তৃণমূল। তবে বিজেপি সরকার যদি মহিলাদের কথা এতই ভাবে, তা হলে তারা অবিলম্বে তাঁদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুক। আবার এ দিন কল্যাণও তাঁর ভাষণে চ্যালেঞ্জ জানান, আগামী বছর উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোট রয়েছে। সাহস থাকলে তার আগেই মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করুক সরকার। এটাও তাঁরা মনে করিয়ে দেন যে, তৃণমূলেই মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব অনেক বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, এ দিন ভোটাভুটিতে যে বিল পাশ করানো যাবে না, সেটা বুঝে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও একটা সময়ে সুর নরম করে তৃণমূলের প্রস্তাব আংশিক মেনে নিতে বাধ্য হন। এ দিন তিনি হঠাত্‍ই বলে ওঠেন, ‘যদি বিরোধীরা মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ করতে বলে সরকার তা–ও করতে রাজি।’ যদিও ডিলিমিটেশন বিল পাশ না–করার ক্ষেত্রে এককাট্টা মনোভাব নেয় নাছোড় ‘ইন্ডিয়া’ শিবির।

    তৃণমূল সূত্রের দাবি, অন্যান্য বার সংসদে বিভিন্ন ইস্যুতে ভোটাভুটিতে বহুবার ক্রসভোটিং হয়েছে। তবে এ দিন সেটা রুখতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছেন অভিষেক তথা বিরোধী শিবিরের অন্য নেতারা। তাঁদের একাংশের ধারণা, এ দিন ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে ২৯৮ ও বিপক্ষে ২৩০টি ভোট পড়লেও যদি সব সাংসদ উপস্থিত থাকতেন, তা হলে বরং শাসক শিবিরেই ক্রসভোটিংয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকত। এটাকেই জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী শিবিরের অন্যতম বড় সাফল্য বলে মনে করছেন অভিষেক।

    দিন কয়েক আগে বাংলায় ভোট প্রচারে এসে রাহুল গান্ধী যুগপৎ কড়া আক্রমণ শাণিয়েছিলেন বিজেপি ও তৃণমূলকে। এমনকী, এ বার বঙ্গে বিধানসভা ভোটে ২৯৪টি কেন্দ্রে একাই লড়ছে কংগ্রেস। এই অবস্থায় রাহুল–অভিষেক কথার পরে আগামী দিনে বঙ্গ রাজনীতিতেও জল নতুন কোনও দিকে গড়াবে কি না, সে দিকে নজর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

  • Link to this news (এই সময়)