• আবেদন করেও নাম ওঠেনি ভোটার তালিকায়, জেলবন্দি স্বামীর সঙ্গে ফের ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন শোভা
    এই সময় | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • বুদ্ধদেব বেরা, বেলপাহাড়ি

    মাত্র ১২ বছর বয়সে সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সক্রিয় মাওবাদী স্কোয়াডের সদস্য হয়ে উঠেছিলেন ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির প্রত্যন্ত গ্রাম মাজুগোড়ার চন্দনা সিং। পরে সেই চন্দনাই হয়ে ওঠেন মাওবাদী নেত্রী শোভা মান্ডি। জামিনে মুক্তির পরে শোভা এখন তাঁর গ্রামে মা লক্ষ্মীরানি সিংয়ের সঙ্গে ছোট্ট একটি অ্যাসবেসটসের ঘরে থাকেন। পরিচয়পত্র বলতে জেলবন্দি অবস্থায় বানানো স্রেফ আধার কার্ডটুকু। কোনও দিন ভোটার তালিকায় নাম তোলেননি শোভা। কিন্তু এখন ভাবনা পাল্টেছে। তাই এ বার বিধানসভা নির্বাচনে সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে চেয়েছিলেন। 'সার' (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) প্রক্রিয়া চলাকালীন নতুন ভোটার কার্ডের জন্য আবেদনও করেছিলেন। নিজের আধার কার্ড আর ২০০২–এর লিস্টে থাকা মায়ের নাম সম্বল করে হিয়ারিংয়ে গিয়েছিলেন শোভা। কিন্তু তার পরেও তালিকায় তাঁর নাম ওঠেনি। তিনি বলছেন, 'ভেবেছিলাম আবেদন করলেই ভোটার কার্ডটা পেয়ে যাব। সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেবো। কিন্তু ফাইনাল লিস্টে আমার নাম ওঠেনি। ভবিষ্যৎ কী? জানি না।'

    ঝাড়গ্রামের জেলা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তথা জেলাশাসক আকাঙ্ক্ষা ভাস্কর বলেন, 'ফর্ম ৬ পূরণ করে নতুন ভোটার কার্ডের জন্য আবেদন করার পরেও ফাইনাল ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে এ বারের ভোট দিতে পারবেন না। তবে ভোটার কার্ডের আবেদনটি গ্রহণ হয়েছে না বাতিল হয়েছে, সেই বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।' ২০০৯–এ ঝাড়খণ্ডের চাকুলিয়া এলাকায় একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় শোভার নাম জড়ায়। ২০১০–এ ঝাড়খণ্ড গ্রেপ্তার হন তিনি। শোভার বিরুদ্ধে বেলপাহাড়ি সমেত পশ্চিমবঙ্গের একাধিক থানা এবং ঝাড়খণ্ডে মামলা রুজু হয়। ঝাড়খণ্ডে পাঁচ বছর বিচার চলার পরে মামলা থেকে খালাস পান শোভা। এ রাজ্যে শোভার বিরুদ্ধে মামলা থাকায় আদালতের নির্দেশে তাঁকে এ রাজ্যের পুলিশের হাতে তুলে দেয় ঝাড়খণ্ড পুলিশ। শোভাকে প্রথমে বহরমপুর এবং তারপরে মেদিনীপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০২৫–এর জুলাইয়ে জামিন পান। দাদা তারক সিং ও বৌদি ছবি সিং মাজুগোড়ার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন শোভাকে।

    প্রথম দিকে দাদা–বৌদির জমিতে চাষের কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে দাদা-বৌদির সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তাঁদের বাড়ি ছেড়ে উল্টো দিকে ছোট্ট একটি ঘরে মায়ের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছেন। রান্নাবান্না সারতে হয় খোলা আকাশের নীচে। শোভা বলেন, 'বৃষ্টির দিনে বাড়িতে রান্না হয় না। শুকনো মুড়ি খেয়ে দিন কাটাতে হয়।'

    এখন নিজের অতীত ভুলতে চাইছেন শোভা। চাইছেন আর পাঁচ জনের মতো বাংলার বাড়ি, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, খাদ্যসাথীর রেশনের চালের মতো সরকারি পরিষেবা। বলেন, 'থাকার মতো বাড়িটুকু নেই। জেলখানার থেকেও ছোট্ট একটি ঘরে রয়েছি। জঙ্গল থেকে পাতা ও মহুল ফুল কুড়িয়ে বেচে আয় করি। এ ভাবে বাঁচা যায়? মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষদের ফেরাতে শুনেছি রাজ্য সরকার অনেককেই চাকরি দিয়েছে। বিভিন্ন প্যাকেজের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। আমার বেলায় চাকরি, আর্থিক সহায়তা নেই কেন? আমিও চাকরি করতে চাই।' মাওবাদী কার্যকলাপে জড়িয়ে থাকতে থাকতেই ঝাড়খণ্ডের রাজেশ মান্ডির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শোভার। রাজেশ মাওবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে বর্তমানে বহরমপুর জেলে বন্দি। শোভার কথায়, 'অনেক দিন তো হলো! এ বার ওকেও জেল থেকে ছেড়ে দিতে পারে। ছোট্ট ঘরে নিজেদের সংসার গড়ে তুলতে চাই। আর চাই ভোট দিতে।'

    যদিও লিস্টে নাম না–থাকায় অনিশ্চয়তা তাঁর চোখেমুখে।

  • Link to this news (এই সময়)