• দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে গঙ্গা, বিপদে ৮৫ কোটি মানুষ
    এই সময় | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: জলবায়ু পরিবর্তন এবং একই সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে দ্রুত কমছে দেশের প্রাণস্বরূপ গঙ্গার জলপ্রবাহ। নদী-বিশেষজ্ঞদের হিসেব, প্রতি বছর গঙ্গার জলস্তর গড়ে ১.৫ থেকে ২ সেন্টিমিটার করে কমছে। গঙ্গা এমন ভাবে অস্তিত্বসঙ্কটে পড়ায় দক্ষিণ এশিয়ার বিরাট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের ভবিষ্যতও অত্যন্ত উদ্বেগজনক জায়গায় পৌঁছেছে।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ১৩০০ বছরে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েনি গঙ্গা। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৮৫ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা এই নদীর উপরে নির্ভর করে। কয়েক হাজার বছর ধরে এই নদীর উপরে নির্ভর করেই ভারতীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেই নদীই শুকিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, মৌসুমি বায়ুর বিন্যাসে বদল, অতিরিক্ত জল উত্তোলন এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণ—সব মিলিয়েই এই বিশাল নদী–ব্যবস্থা ক্রমশ ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে। প্রভাব পড়ছে বিরাট একটা এলাকার খাদ্য উৎপাদন, পানীয় জল ও জীবিকার উপরে।

    প্রাচীন যুগের জলবায়ু কেমন ছিল, কী ভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সেই জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে — সেই বিষয়ে যাঁরা গবেষণা করেন অর্থাৎ ‘প্যালিওক্লাইমেটোলজিস্ট’–রা প্রাচীন জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য, ঐতিহাসিক নথি এবং হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং এক সঙ্গে ব্যবহার করে আধুনিক সময় থেকে ক্রমশ পিছিয়ে খ্রিস্টীয় ৭০০ সাল পর্যন্ত গঙ্গার জলস্তরের হিসাব পুনর্গঠন করে দেখেছেন, ১৯৯১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত সময়সীমা এই নদী অববাহিকার ইতিহাসে শুষ্কতম তিন দশক। নদীর জলস্তরে পরিবর্তনের ফলে ভারতে অতীতের বেশ কয়েকটি খরার সময়কাল সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৬৯-১৭৭১-র মধ্যে বাংলায় যে দুর্ভিক্ষ ‘৭৬–এর মন্বন্তর’ নামে পরিচিত, সেই দুর্ভিক্ষ এবং চতুর্দশ শতকের কুখ্যাত কয়েকটি দুর্ভিক্ষও রয়েছে। এগুলির ফলে ব্যাপক ফসলহানি ও মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

    তবে ১৯৯১–তে হঠাৎ করেই এই নদীর প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ৬২০ ঘনমিটার কমে যায়। গঙ্গার প্রবাহের এতটা অবনমন আগে কখনও হয়নি। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ১৯৯১ থেকে ২০২০–র মধ্যে গঙ্গা অববাহিকায় চারটি এমন খরা দেখা গিয়েছে যেগুলির স্থায়িত্ব অন্তত তিন বছর ছিল। ঐতিহাসিক ভাবে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি খরা সাধারণত ৭০ থেকে ২০০ বছরের ব্যবধানে ঘটত বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। গঙ্গার এমন অস্বাভাবিক ভাবে শুকিয়ে যাওয়ার বড় কারণ হল নদী অববাহিকায় মৌসুমি বৃষ্টিপাতের হ্রাস। এর সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গান্ধীনগরের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’–র অধ্যাপক বিমল মিশ্র বলেন, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে স্থলভাগ ও সমুদ্রের তাপমাত্রার পার্থক্য এতটাই কমে গিয়েছে যে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং গঙ্গা অববাহিকায় বৃষ্টিপাত কমেছে।’

    নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, জল সরবরাহ ও পরিবেশ–ব্যবস্থার উপরে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে এর কঠিন মূল্য দিতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গিয়েছে, যে নদীপথে এক সময়ে বাংলা ও বিহার থেকে বারাণসী ও এলাহাবাদ পর্যন্ত নৌকা চলাচল করত, সেই পথে এখন আর নৌকা চলাচল করতে পারে না। গঙ্গার এমন শুকিয়ে যাওয়ার তীব্রতা সম্পর্কে জলবায়ু মডেলগুলির কোনও পূর্বাভাস দিতে না-পারাও চিন্তার বিষয় বলে মনে করছেন গবেষকরা।

  • Link to this news (এই সময়)