• সুনীতি চট্টরাজের জনসেবার আদর্শকে পাথেয় করে ময়দানে সিউড়ির উজ্জ্বল
    বর্তমান | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: বীরভূমের রাজনীতিতে যাঁর নাম ছিল এক চিরকালীন আবেগ, সেই ‘সোনাদা’ ওরফে সুনীতি চট্টরাজের ভাবমূর্তিকেই এবারের নির্বাচনে হাতিয়ার করতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস। সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় আদতে সুনীতিবাবুরই দীর্ঘদিনের ‘ছায়াসঙ্গী’। ভোট-ময়দানে সোনাদার সেই জনমুখী রাজনীতির উত্তরাধিকারকেই মানুষের সামনে তুলে ধরছেন উজ্জ্বলবাবু।

    সিউড়ির রাজনীতির ইতিহাসে সুনীতি চট্টরাজ এক বর্ণময় নাম। সিউড়ির চারবারের বিধায়ক। ১৯৭১ সালে সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রথমবার লড়েছিলেন কংগ্রেসের হয়ে। বাম প্রার্থীর কাছে অবশ্য হেরে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরের বছরই জয় ছিনিয়ে আনেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মন্ত্রিসভায় বিদ্যুৎ ও সেচদপ্তরের কনিষ্ঠতম মন্ত্রী হিসেবে জায়গা করে নিয়ে সোনাদা চমকে দিয়েছিলেন গোটা রাজ্যকে। সত্তরের দশকে বিধানসভায় জ্যোতি বসুর বিরুদ্ধে বিরোধীদের ‘শাউটিং স্কোয়াড’-এর অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। কখনও লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে লণ্ঠন হাতে, আবার কখনও সেতুর দাবিতে খালি গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে বিধানসভায় হৈচৈ ফেলে দেওয়া— সুনীতি চট্টরাজ ছিলেন আপাদমস্তক এক লড়াকু জননেতা। এর পরে ১৯৭৭ ও ১৯৮২ সালের  বিধানসভা নির্বাচনেও তিনি জয়ী হয়েছিলেন। যদিও ’৮৭ ও ’৯১ সালে পরপর দু’ বার তিনি সিপিএমের তপন রায়ের কাছে হেরে যান। ১৯৯৬-এ ফের বীরবিক্রমে ফিরে এসেছিলেন সোনাদা।

    তবে কেবল বিধানসভার লড়াই নয়, সোনাদা বীরভূমের মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তাঁর অকৃত্রিম জনসেবার মাধ্যমে। কলকাতা থেকে জেলা— অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় রাতবিরেতে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাব। তাঁর সেই সেবামূলক রাজনীতিরই যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছেন উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। ২০০০ সালে কাউন্সিলার হয়ে শুরু করেন উজ্জ্বল। এরপর ২০০৫ সালে ভাইস চেয়ারম্যান। ২০১৬ সালে অনুব্রত মণ্ডলের হাত ধরে প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালেও চেয়ারম্যান পদে তাঁর উপরই ভরসা করে দল। ২০০০ সাল থেকে এখনও সিউড়ির মানুষের কাছে এক ভরসার নাম উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়।

    উজ্জ্বলবাবুকে ২০২৬-এর মহারণে প্রার্থী করার নেপথ্যে দলের একটাই যুক্তি— মানুষের বিপদে-আপদে তাঁকে সবসময় পাশে পাওয়া যায়। এই ‘জনমুখী’ ভাবমূর্তিই তৃণমূল প্রার্থীর ইউএসপি। গভীর রাতে শ্মশানে মৃতদেহ সৎকারে পাশে থাকা থেকে শুরু করে গরিব ঘরের মেয়ের বিয়েতে নিজের সামর্থ্য উজাড় করে দেওয়া। কোনো মেধাবী ছাত্রের পড়ার খরচ আটকে গেলে কিংবা মুমূর্ষু রোগীর কলকাতায় চিকিৎসার প্রয়োজন পড়লে, সিউড়ির মানুষ আজও জানেন ‘উজ্জ্বলদা’র ফোন নম্বরটিই তাঁদের রক্ষাকবচ। উজ্জ্বল যেন সেই পুরনো সোনাদা। সেই ভাবমূর্তিকে পাথেয় করেই এবার বিধানসভা জয়ের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়েছেন তিনি।

    প্রার্থী নিজেও বলছেন, আমার রাজনীতির পাঠ সোনাদার হাত ধরেই। মানুষের সেবা করাটা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, ওটা রক্তে থাকতে হয়। এটাই সোনাদার শিক্ষা। শহর তৃণমূল কংগ্রেসের সহ সভাপতি রমারঞ্জন চট্টোপাধ্যায় বলেন, সুনীতি চট্টরাজ ছিলেন সিউড়ির মানুষের আবেগ। উজ্জ্বল সোনাদার আদর্শেই মানুষের সেবা করে চলেছেন। সাধারণ মানুষ জানে, বিপদে পড়লে উজ্জ্বলকে দোরগোড়ায় পাওয়া যাবে। এবারের নির্বাচনে সোনাদার আশীর্বাদ আর মানুষের ভালোবাসাই আমাদের জয়ের পথ প্রশস্ত করবে। তবে, প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এই বিধানসভা নির্বাচনে সিউড়ির মানুষ কি ‘কাজের লোক’ উজ্জ্বলকেই বেছে নেবেন, নাকি রাজনীতির মেরুকরণের হাওয়ায় ধুয়ে যাবে সোনাদার স্মৃতি? উত্তর দেবে সময়। • প্রচারে তৃণমূলের উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। -নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)