চন্দ্রিমার ভোটবাক্সে ‘উত্তুরে’ হাওয়া, তন্ময়ের ব্যর্থতা, দীপ্সিতার দু’বারের পরাজয়ের রেকর্ড
বর্তমান | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
রাহুল চক্রবর্তী, বিরাটি: ‘আমার বন্ধু দীপ্সিতাকে সিপিএম একবার নিয়ে গিয়েছিল বালি। আর একবার শ্রীরামপুর। দু’জায়গাতেই পরাজিত হয়েছে। তৃতীয়বার দমদম উত্তরে পরাজয়ের পর দীপ্সিতাকে সিপিএম কোথায় পাঠাবে, সেই প্রশ্নটা থাকল।’ বিরাটি বণিক মোড়ের পথসভা থেকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন সদ্য সিপিএমত্যাগী তৃণমূল নেতা প্রতীক উর রহমান।
সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতা তথা উত্তর দমদম পুরসভার প্রাক্তন পুরপ্রধান সুনীল চক্রবর্তী স্বীকার করে নিলেন, ‘বিধায়ক হিসাবে তন্ময় ভট্টাচার্যের ব্যর্থতা ছিল। তা না হলে এই অঞ্চলে সিপিএমের সংগঠন আরও ভালো হত।’ দু’টি পৃথক ঘটনার নির্যাস একটাই—তন্ময়ের ব্যর্থতা আর দীপ্সিতার দু’বারের পরাজয়ের রেকর্ডে স্বস্তির ফুরফুরে হাওয়া জোড়াফুল শিবিরে।
কেন্দ্রের নাম দমদম উত্তর। ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে এই কেন্দ্রের গুরুত্ব অপরিসীম। বিরাটি থেকে ১৫ মিনিট দূরত্বে রয়েছে কলকাতা বিমানবন্দর। এক পাশে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে। অন্য অংশে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে। আবার বি টি রোড থেকে যশোর রোডকে জুড়ে রেখেছে এই এলাকা। উন্নয়নের মানচিত্রে আগের থেকে অনেক পোক্ত জায়গা করে নিয়েছে উত্তর দমদম। আগে দমদম বিধানসভার অন্তর্ভুক্ত ছিল অঞ্চলটি। ২০১১ সালে দমদম উত্তর নামে নতুন বিধানসভা তৈরি হয়। ঘটনাচক্রে সেই বছরই রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। সেই সূত্রে নবগঠিত দমদম উত্তর বিধানসভায় প্রথম জোড়াফুলের পতাকা উড্ডীন হয় চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের হাত ধরে। তবে সেই জয় তৃণমূল ধরে রাখতে পারেনি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে পরাজিত করে বিধায়ক হন সিপিএমের তন্ময় ভট্টাচার্য। তার পাঁচ বছর পর, ২০২১ সালের নির্বাচনে তন্ময় ভট্টাচার্যকে পরাজিত করে বিধায়ক হন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য।
দমদমকে একসময় সিপিএমের দুর্গ বলা হত। প্রয়াত সুভাষ চক্রবর্তীর হাত ধরে এসব অঞ্চলে লাল পতাকার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ক্রমাগত রক্তক্ষরণে ৪৬ বছর ধরে পরিচালনা করা উত্তর দমদম পুরসভার বোর্ডও ধরে রাখতে পারেনি লাল পার্টি।
উত্তর দমদম এবং নব বারাকপুর পুরসভা নিয়ে দমদম উত্তর বিধানসভা গঠিত। দু’টি পুরসভাই তৃণমূলের হাতে। বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধারে ঢালাই কারখানা স্টপেজে বসানো বিরাট হোর্ডিংয়ে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা, নিমতায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, নিউ বারাকপুর পুলিশ স্টেশন, বিরাটি কলেজে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস, বিরাটি ডায়ালিসিস সেন্টার, বিরাটি ফায়ার স্টেশন, নিমতা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আইটিআই কলেজ , নব বারাকপুর।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলছেন, ‘দমদমের মধ্যে এই উত্তর দমদম অঞ্চল পিছিয়ে পড়া ছিল। আবার নব বারাকপুর ছিল খড়দহের মধ্যে পিছিয়ে পড়া জায়গা। সিপিএম যতদিন ক্ষমতায় ছিল, ততদিন এই অঞ্চলে নজর দেয়নি। কোনো উন্নয়ন হয়নি। যেখানে একটা সময় রোজ বোমা-গুলির আওয়াজ শোনা যেত, সেখানে ২০১১ সালে দমদম উত্তরের মানুষ সিপিএমকে হটিয়ে পেয়েছেন মুক্তির স্বাদ।’
পালটা বিরাটি শিবাচলে সিপিএমের তরুণ তুর্কি দীপ্সিতা ধরের পোস্টার বলছে, ‘দমদম উত্তর, ফিরিয়ে আনো সাত্তাত্তর।’ তাঁর স্লোগান, ‘আনতে চলেছি লাল টুকটুকে দিন...।’ সেই ‘লাল দিন’ ফিরিয়ে আনার সংকল্প নিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘পরিবর্তন ঘটিয়ে ২০১১ সালের আগের অবস্থাই ফিরিয়ে আনতে চাইছে জনগণ।’ জবাবে চন্দ্রিমা বলছেন, ‘৭৭-এ তো দীপ্সিতা জন্মায়নি। ওই সময়টা কেমন ছিল, দেখেনি। ও আগে জেনে নিক, সেই সময়ের দুর্বিসহ অবস্থা কেমন ছিল। তাই দমদম উত্তরের মানুষ আর কখনও সাতাত্তর ফিরিয়ে আনবে না। এগিয়ে যাবে।’
দমদম উত্তরে বিজেপির হয়ে লড়ছেন সৌরভ সিকদার। প্রয়াত বিজেপি নেতা তপন সিকদারের ভাইপো তিনি। তপনবাবুর নামে ভোটও চাইছেন। তবে সৌরভের প্রচারে অটো-টোটো ছুটলেও লোক সমাগম তেমন নেই। কংগ্রেস প্রার্থী হয়েছেন ধনঞ্জয় মৈত্র। শক্তি নামে এলাকায় পরিচিত তিনি। এর আগেও ভোটে দাঁড়িয়ে পরাজিত হয়েছেন। দমদম উত্তরে নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা রয়েছে। নদীকূল এলাকা তার মধ্যে অন্যতম। পুরপ্রধান বিধান বিশ্বাস আশ্বাস দিয়েছেন, মাস্টারপ্ল্যান করে নিকাশি সমস্যার সমাধান করা হবে।
তবে আলোচনায় আছে সিপিএম। সেখানে দমদম উত্তরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, ‘দম থাকলে তন্ময়কে দাঁড় করালো না কেন? দমদমে উত্তর পেয়ে যেত সিপিএম!’