• উন্নয়নের নিরিখেই প্রতিবার বাড়ে ব্যবধান, এবারও ৭০ হাজার ‘লিডের’ আশায় তৃণমূল
    বর্তমান | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • শ্যামলেন্দু গোস্বামী, মিনাখাঁ: জলই এখানে প্রথম শব্দ, শেষও। ভোরের আলো ফোটার আগেই মিনাখাঁ জেগে ওঠে জলের নিঃশব্দ দুলুনিতে। জাল কাঁধে মানুষ নেমে পড়ে জলে। কেউ নৌকা ঠেলে এগয়। দূরে বিদ্যাধরী নদী— চোখে পড়ে না সব সময়। কিন্তু এর প্রভাব লেগে থাকে প্রতিটি ঘরে। এই ভূগোলে দিন মানে ভরসা আর আশঙ্কার মাঝে বেঁচে থাকা। সোনাপুকুরের ঘাটে দাঁড়িয়ে মৎস্যজীবী আলিম মোল্লা বলছিলেন, জলেই নামতে হয়, না হলে পেট চলবে না! একটু থেমে চোখ তুলে যোগ করলেন, আবার জল বাড়লেই সব শেষ। আর এই দ্বৈত চরিত্র মিনাখাঁর স্বভাব। শংকরপুরের চায়ের দোকানে বসে কথাটা অন্যভাবে শোনা গেল। একজন বললেন, বন্যার সময় ত্রাণ শিবির হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বৃষ্টি বাড়লে আগে নিজের ঘরটাই বাঁচাতে হয়। বৃদ্ধ গোলাম ফরিদের সংযোজন, নদীকে আটকে রাখা যায় না, তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ধীরে ধীরে উঠে আসে অন্য বয়ান— উন্নয়নের। খুব জোরে নয়, কিন্তু অস্বীকারও করা যায় না। শংকরপুরের রাজু পাল বলছিলেন, কাজ হয়েছে, সেটা না বললে ভুল হবে। চোখে পড়ার মতো কাজ হয়েছে রাস্তায়। যেখানে এক সময় কাদা আর জলের দাপট ছিল, এখন সেখানে পাকা রাস্তা ধরে ছুটছে টোটো। 

    বামুনপুকুর মোড়ে চায়ের দোকানে বসে গল্প হচ্ছিল সুজয় দে ও টোটোচালক শ্রীমন্ত বিশ্বাসের সঙ্গে। শ্রীমন্তের কথায়, এখন রাস্তা ভালো হয়েছে। গ্রামের ভিতরে সহজেই টোটো নিয়ে চলে যাওয়া যায়। শালিপুরে মাছের ভেড়ির পাশ দিয়ে গাড়ির চাকা গড়াচ্ছে। সাইকেলে সবজি নিয়ে আসছেন দীপন সূত্রধর। হাত তুলে তাঁকে দাঁড় করাতেই তিনি অবাক। 

    এলাকায় চাষবাসের কি পরিস্থিতি? জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আলুর দাম এবার অনেকটাই কম। রাজ্য সরকার পাশে দাঁড়াবে বলেছে। শান্তি পেয়েছি। এরপরেই তাঁর সংযোজন, আগে চাষ করে কিছু থাকত না। এখন কিষানমান্ডি হয়েছে। সবজি বিক্রি করা যায়। এটা কাজে লেগেছে আমাদের। জলের উপর দাঁড়ানো অর্থনীতিও বদলাচ্ছে। মাঝেরপাড়ার পুকুরঘাটে জাল টানতে টানতে মাছচাষি ফিরোজ মোল্লার গলায় আত্মবিশ্বাসের সুর। বললেন, এখন আন্দাজে নয়, বিজ্ঞান মেনে চাষ হয়। মাছ বাইরে যায়, বিদেশেও। গল্পের ছলে তিনি বললেন, আগে জমির মালিকরা বছরে বিঘা প্রতি খুব বেশি হলে ১০ হাজার টাকা পেতেন। এখন সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা পান। এটা তৃণমূলের সৌজন্যেই সম্ভব বলে তাঁর দাবি।

    স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে পরিবর্তনের রেখা স্পষ্ট। উঁচিলদহের গৃহবধূ দেবী পাল বলেন, মিনাখাঁ হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে। তবে, ডাক্তার সবসময় থাকলে আরও ভরসা পেতাম। চায়ের দোকান থেকে হাটের ভিড়— একই কথা ঘুরে ফিরে আসছে, প্রতিবার তৃণমূলের লিড বেড়েছে মিনাখাঁয়। এবার জয়ের ব্যবধান ৭০ হাজারে বাঁধতে চাইছেন দলের নেতারা। 

    অনেকেরই প্রশ্ন, এও কি সম্ভব? তৃণমূল কর্মীদের কাছে উত্তর তৈরি। তাঁরা বলছেন, মানুষ দেখেছে কাজ হয়েছে। আইএসএফের সঙ্গে জোটের বিষয়টি সিপিএমের স্থানীয় নেতাদের কাছে অস্বস্তির বলেই দাবি করছেন মিনাখাঁর মানুষ। মালঞ্চর বাসিন্দা সিরাজ মিস্ত্রি, হাফিদুল গাজিরা বললেন, শুনেছি, সিপিএম নাকি আইএসএফকে ভোট দিতে চাইছে না। বলছে, খামবন্দি হতে চাই না। তৃণমূল প্রার্থী ঊষারানি মণ্ডল বললেন, লালপার্টির অনেক কর্মী আমাদের সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ করছেন। বাইরে কিছু না বললেও জোড়াফুলের দিকেই ঝুঁকছেন অনেকে। এবার আমাদের লিড ৭০ হাজার হবে। আইএসএফ প্রার্থী প্রতীক মণ্ডলের দাবি, তৃণমূলীরাই এসব প্রচার করছে। জোটের সবাই আমার সঙ্গে প্রচার করছেন। লড়াই এবার হবে হাড্ডাহাড্ডি। বিজেপি প্রার্থী রুদ্রেন্দু পাত্রর বক্তব্য, মানুষ তৃণমূলকে চাইছে না। কারণ, বিধায়ককে মানুষ পাননি। ওদের অত্যাচার মানুষ মনে রেখেছে।
  • Link to this news (বর্তমান)