• ‘উত্তপ্ত’ তকমা ঘুচিয়ে ভাঙড়ে উন্নয়নের ফুল ফোটাতে প্রত্যয়ী জোড়াফুল শিবির, কলকাতা পুলিশের আওতায় আসায় কমেছে অপরাধ, দুর্ঘটনা
    বর্তমান | ১৮ এপ্রিল ২০২৬
  • স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: কলকাতার সীমানা পেরলেই বাসন্তী হাইওয়ের উপর চোখে পড়বে টিনের শেড দেওয়া চায়ের দোকান। ওই দোকানের মাথায় পতপত করে উড়ছে আইএসএফ ও তৃণমূল উভয় দলের পতাকা। ‘দাদা, চালতাবেড়িয়া কোন দিকে?’— প্রশ্ন করতেই একপলকে গাড়ির ‘প্রেস’ লেখাটায় চোখ বুলিয়ে দোকানির সটান জবাব, ‘যেখানে বোমা ফেটেছিল, সেখানে যাবেন তো?’ 

    ‘প্রেস’ কিংবা ‘পুলিশ’ লেখা গাড়ি এলাকায় ঢুকলেই এখানকার লোকে বুঝে যায়, আশপাশে কোথাও গণ্ডগোল হয়েছে। এই গাড়ির গন্তব্য সেখানেই। হয় গোলাগুলি, না হয় বোমাবাজি, কিংবা খুন— এটাই হল ভাঙড়ের রোজনামচা। হিংসার দহনে এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই তপ্ত। তার উত্তাপ ছড়িয়েছে ভোটের ময়দানেও।

    বর্তমান বিধানসভায় ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফের জন্য মাত্র একটি আসন বরাদ্দ। ২০২১ সালে তৃণমূল প্রার্থীকে পরাস্ত করে খাতা খুলেছিল আইএসএফ। জিতেছিলেন নৌশাদ সিদ্দিকি। তবে তিনি জিতলেও এখানে আইন-শৃঙ্খলার চরিত্রে কোনো বদল আসেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বরং গণ্ডগোল বেড়েছে। ভাঙড়ের এই ‘উত্তপ্ত’ তকমা যেনতেন প্রকারেণ ঘোচাতে চান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই লক্ষ্যেই ২০২৪ সালে ভাঙড়ের প্রায় ১২৫ বর্গ কিলোমিটার অংশ কলকাতা পুলিশের অন্তর্ভুক্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী। তৈরি হয় নতুন পুলিশ ডিভিশন। তার অধীনে রয়েছে ৬টি থানা ও একটি ট্রাফিক গার্ড। লালবাজারের দাবি, কলকাতা পুলিশ দায়িত্ব নেওয়ার পর ভাঙড়ে অপরাধের হার কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ। দুর্ঘটনার হার কমেছে ৩৭ শতাংশ। এই ডিভিশনের জন্য তৈরি হয়েছে পৃথক গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের তীক্ষ্ণ নজরদারির কারণেই কমেছে স্থানীয়দের গুণ্ডাদের নড়াচড়া। পুলিশের অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট বলছে, ভাঙড় উত্তপ্ত হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক গ্যাং-ওয়ার। তার একদিকে রয়েছে আইএসএফ, অন্যদিকে, ভাঙড়ের একদা ‘হর্তা-কর্তা-বিধাতা’ আরাবুল ইসলাম। ২০০৬ সালে যখন বামেদের দাপট মধ্যগগনে, তখন ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রে জোড়াফুল ফুটিয়েছিলেন আরাবুল। ২০১১ সালে পালাবদলের বছরে এই আসন হাতছাড়া হয় তৃণমূলের। তবে ভাঙড়ে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন আরাবুল। এবারের নির্বাচনে তিনি আগে জার্সি বদলে নাম লিখিয়েছেন আইএসএফে।

    ভাঙড়ে এই গ্যাং-ওয়ার নির্মূলে গত পাঁচ বছরে আইএসএফ বিধায়ক নৌশাদ সিদ্দিকির কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বরং তৃণমূলের ঘাড়েই ‘দোষ’ চাপাতে ব্যস্ত তিনি। নৌশাদের বক্তব্য, ‘এলাকায় বোমা-গুলির নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। থানায় কোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। গত পাঁচ বছর আইনসভার ভিতরে ও বাইরে মানুষের জন্য লড়াই করেছি। ভবিষ্যতেও করব।’

    ভাঙড় বলছে, বিজেপির সঙ্গে আইএসএফের রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিতে কোনো তফাত নেই। দুই পার্টিই ধর্মীয় মেরুকরণের নীতিতে বিশ্বাসী। তাই পরিবর্তনের পথ খুঁজছেন বাসিন্দারা। তৃণমূলের টিকিটে এবার ভাঙড়ে লড়বেন শওকত মোল্লা। ক্যানিং পূর্ব বিধানসভার বিধায়ক তিনি। দলের নির্দেশে এবার নৌশাদকে হারানোর গুরুদায়িত্ব পড়েছে তাঁর উপর। শওকত বলছেন, ‘ভাঙড় মানেই গোলা-বারুদের রাজনীতি। এসব মানুষ আর চাইছেন না। তাই এবার বদল আসছেই। মুখ্যমন্ত্রীর সাধের প্রকল্পের উপর ভরসা রেখে এবার উন্নয়নের জোয়ারে গা ভাসাবে ভাঙড়।’

    অন্যদিকে, গত দুই বিধানসভার ভোট-অঙ্ক বলছে, ভাঙড় আসনে পদ্মপার্টি কোনো ফ্যাক্টর নয়। ২০১৬ সালে বিজেপির ভোট ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। একুশে তা বেড়ে হয় ১৭ শতাংশ। এবারেও তাদের আসন দখলের আশা নেই। বরং, ষোলোতে তৃণমূলের ভোট ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। গতবার তা ৩৪ শতাংশে নেমে যায়। হারানো ভোট পুনরুদ্ধার করতে পারলেই ছাব্বিশে ভাঙড় ফের তৃণমূলের পকেটে। 
  • Link to this news (বর্তমান)