অর্ঘ্য ঘোষ, নানুর
'আমি ভয় করব না ভয় করব না । দু'বেলা মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না'- কবিগুরুর গানটি যেন নানুরের সিপিএম প্রার্থী শ্যামলী প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে গিয়েছে। গ্রাম পঞ্চায়েত হোক বা লোকসভা ভোট ধারাবাহিক জয়ের রেকর্ড যেমন আছে, তেমনই হেরেছেনও বার কয়েক। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে শাসকদলের হুমকি কিংবা হামলার মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালাননি।
অনমনীয় মনোভাবের জন্য এ বারেও নানুর কেন্দ্রে সিপিএম তাঁকে প্রার্থী করেছে। স্থানীয় কুমিড়া গ্রামে নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম ৫৪ বছরের শ্যামলীর। ১৩ সদস্যের একান্নবর্তী পরিবার, দুই ভাই পুনেতে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করেন। বাবা কৃষি দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মী দিলীপ প্রধান স্থানীয় চণ্ডীদাস-নানুর পঞ্চায়েতের প্রধান তথা কৃষকসভার অঞ্চল কমিটি এবং সরকারি কর্মচারী সংগঠনের ব্লক সদস্য ছিলেন। বামপন্থী পরিবারে বেড়ে ওঠা শ্যামলী খুজুটিপাড়া কলেজে পড়ার সময়ে বাম ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯১-এ সিপিএম পার্টির সদস্যপদ পান, ১৯৯২-এ লোকাল কমিটির সদস্য এবং ২০১২-এ দলের মহিলা সংগঠনের জেলা সম্পাদক হন। পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী শ্যামলী বর্তমানে রাজ্য কমিটি এবং মহিলা সংগঠনের সদস্য। ২০০৩-এ চণ্ডীদাস-নানুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য, পরের নির্বাচনে জেলা পরিষদের জনস্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ, দু'বার নানুর পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য, ২০১৬-এ নানুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১১, ২০২১-এর বিধানসভা ভোট এবং ২০২৩-এ ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনে জেলা পরিষদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচনেও বোলপুর কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেছেন। ২০২১-এর ভোটে তৃণমূলের বিধানচন্দ্র মাঝি ১,১২,১১৬ ভোট পেয়ে বিজেপির তারকেশ্বর সাহাকে ৬,৬৭০ ভোটের ব্যবধানে হারান। শ্যামলী প্রধান ১২,৮৭৮ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও তিনি ৯৯,৩৮৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। ওই নির্বাচনে তৃণমূলের অসিত মাল এবং বিজেপির পিয়া সাহা যথাক্রমে ৮,৫৫,৬৩৩ এবং ৫,২৮,৩৮০ ভোট পান। তার মধ্যে বিধানসভা ভিত্তিক ফলাফলের নিরিখে নানুরেই প্রায় ৮৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিল শাসকদল। এ বার তারা সেই ব্যবধান ছাপিয়ে যাওয়ার টার্গেট নেওয়ার কথা বলছেন। কংগ্রেস-বিজেপিও পুরো উদ্যমে মাঠে নেমে পড়েছে।
সব মিলিয়ে এ বারের লড়াইটা যে শক্ত তা অস্বীকার করছেন না সিপিএম নেতৃত্ব। শ্যামলী রোজ সকালে কর্মীদের সঙ্গে প্রচারে বেরোচ্ছেন। ফিরছেন রাতে। প্রচারে রাজ্য ও কেন্দ্র দুই সরকারের উদ্দেশেই তোপ দাগছেন। সিপিএমের নানুর-কীর্ণাহার এরিয়া কমিটির সম্পাদক আসগর আলি, জেলা কমিটির সদস্য মনোতোষ হাজরা বলেন, 'সাদাসিধে দুর্নীতি মুক্ত জীবনযাপন এবং লড়াকু মনোভাবের জন্য আমাদের প্রার্থী এক কদম এগিয়ে রয়েছেন। স্বচ্ছ নির্বাচন হলে ভালো ফলের আশা করাই যায়।'
শ্যামলী বলেন, 'সংগঠন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে বহুবার বহু হুমকি এমনকী, জীবন সংশয়ের মুখে পড়েছি। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালাইনি। হারজিত যা-ই হোক না কেন, কোনও দিন পালাবও না।' তৃণমূলের ব্লক সভাপতি সুব্রত ভট্টাচার্য বলেন, 'সিপিএমের মুখে স্বচ্ছতার কথা সোনার পাথরবাটির মতো। এ বারের নির্বাচনে বিরোধীদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা ২০২৪-এর লোকসভার থেকেও বেশি ব্যবধানে জেতার যোগেটি নিয়েছি।'