সংসদে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার লক্ষ্যে আনা সংবিধান সংশোধনী বিল মুখ থুবড়ে পড়েছে লোকসভায়। ১২ বছরে এই প্রথম বার বিরোধীদের সম্মিলিত শক্তির কাছে হেরে কার্যত মুখ পুড়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকারের। এই পরিস্থিতিতে ঘুরপথেই মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার ভাবনাচিন্তা করছে কেন্দ্র। সংবিধান সংশোধনী এনে যাতে আর বিরোধীদের কাছে ভোটপ্রার্থনা করতে না হয়, তা মাথায় রেখেই নেওয়া হচ্ছে ভিন্ন কৌশল। শলাপরামর্শ করা হচ্ছে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও। এমনটাই খবর দিল্লির সরকারি সূত্রে।
২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর না হলে বিরোধীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে বলে সংসদেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। হাতে সংখ্যা না থাকায় বিল পাশের কোনও সম্ভাবনা নেই ধরে নিয়ে শেষের দিকে সরকারপক্ষ খানিক সুর নরমও করেছিল। বিরোধীদের সঙ্গে দর কষাকষির জায়গা তৈরি করেছিলেন শাহ। কিন্তু শেষমেশ তা ঘটেনি। প্রত্যাখ্যাতই হয়েছে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করতে সরকারপক্ষের আসন পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব। তবে লোকসভায় পিছু হটতে হলেও, সরকার যে তার প্রচেষ্টা থেকে সরে যাবে না, তা শনিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে স্পষ্ট করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আধ ঘণ্টার ভাষণে বিরোধীদের বিরুদ্ধে লাগাতার তোপ দেগে মোদী বলেছেন, ‘এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। সরকার এই বিল কার্যকর করেই ছাড়বে।’
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, মোদী সরকার বুঝে গিয়েছে, সংবিধান সংশোধনী এনে মহিলা সংরক্ষণ বা লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস তারা করতে পারবে না। অন্তত ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে। কারণ, সংবিধান সংশোধনীর জন্য যে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন, তা তাদের হাতে নেই। তাই বিরোধীদের মুখের দিকে না চেয়ে থেকে অন্য কিছু ভাবা জরুরি। যাতে আর সংবিধান সংশোধনী না আনতে হয়! এর জন্য মোদী সরকার ইতিমধ্যেই সংবিধান-বিশেষজ্ঞ এবং আইনজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। সংবিধান সংশোধনী না এনে আসন পুনর্বিন্যাস করে আর কোন পথে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করা যায়, তা-ই নিয়েই আপাতত ভাবনাচিন্তা চলছে।
সংবিধান সংশোধনী লোকসভায় খারিজ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই ঘরে-বাইরে নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছেন মোদী-শাহেরা। হার নিশ্চিত বুঝেও কেন তাঁরা সংবিধান সংশোধনীর পক্ষে হাঁটলেন? বিরোধীদের সাহায্য ছাড়া তা সম্ভব নয় বুঝেও মোদী সরকার ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করল না কেন? বিজেপি-র একাংশের মত, মোদী-শাহ ধরে নিয়েছিলেন, মহিলা সংরক্ষণের বিরোধিতা করলে রাজনৈতিক ভাবে বিপাকে পড়তে হবে ভেবে বিরোধীরা এই বিলে সমর্থন করবেন বা সরাসরি সমর্থন না করলেও ভোটাভুটি থেকে দূরে থাকবেন। কিংবা বিরোধীরা নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ই করে উঠতে পারবেন না এত কম সময়ের মধ্যে। আবার পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে ব্যস্ত থাকায় তৃণমূল, ডিএমকে ব্যস্ত থাকায় তাঁদের সাংসদরা লোকসভায় হাজির হবেন না। এর কোনওটাই হল না। উল্টে মোদী সরকারকে ভোটাভুটিতে হারিয়ে বিরোধী শিবির চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
শুধু তা-ই নয়, লোকসভায় ভোটাভুটির যে ফলাফল প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে সরকারপক্ষের মধ্যেও ফাটল রয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। তাঁদের যুক্তি, শুক্রবার ৫২৮ জন উপস্থিত সাংসদের মধ্যে শাসক শিবিরের পক্ষে গিয়েছিল ২৯৮টি ভোট। প্রয়োজন ছিল ৩৫২টি ভোট। সেখানে বিরোধীরা পেয়েছেন ২৩০টি। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিরোধীদের লোকসভার শক্তি ছিল ২৩৪। এ দিকে তৃণমূল ও শিবসেনার উদ্ধব গোষ্ঠীর একাধিক সাংসদ অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বিরোধীরা ২৩০টি ভোট পেয়েছে। এর থেকেই স্পষ্ট, এনডিএ শিবিরের বেশ কয়েকটি দল বিরোধীদের সমর্থন করেছেন। অন্য দিকে, লোকসভায় সরকার পক্ষের শক্তি ছিল ২৯৪। ওয়াইএসআর কংগ্রেসের সাংসদেরা সমর্থন করলে ওই সংখ্যা তিনশো পেরিয়ে যাওয়ার কথা। কারা পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে, সেটাই এখন খুঁজে দেখছেন এনডিএ নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মত, এই পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেই কারণেই লোকসভা ভোটের আগে চারশো পারের কথা বলেছিলেন মোদী। এই সমস্ত কিছুর ভাবনা তখন থেকেই ছিল। কিন্তু বিরোধীদের সম্মিলিত শক্তির জোরে তাঁদের পিছু হটতে হলো। বর্ষীয়ান সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পিডিটি আচার্য বলেন, ‘২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে নেমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারবারই বলতেন আব কী বার, চারশো পার৷ আসলে উনি জানতেন, ৫৪৩ আসন বিশিষ্ট লোকসভায় যে কোনও সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে হাতে থাকতে হবে ৩৬০টি ভোট৷ রাজীব গান্ধীর আমলে কংগ্রেসের হাতে এই সংখ্যা ছিল। শুক্রবার লোকসভায় যে ভাবে ব্যর্থ হয়েছে মোদী সরকার, তার বীজ বপন হয়ে গিয়েছিল ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিনেই৷’