এই সময়: রাজ্যে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও রক্তপাতহীন ভোটের লক্ষ্যে এ বার থানার ওসি–আইসিদের কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল। শনিবার ভার্চুয়াল বৈঠকে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘ভোটের দিন রাস্তায় অস্ত্র, বোমা, গুলি পাওয়া গেলে আপনারা রেহাই পাবেন না। সাসপেন্ড হতে হবে। আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে কমিশন।’ ২০২১-এর বিধানসভা ভোট পরবর্তী হিংসার কথা মাথায় রেখে কমিশন এ বার প্রথম থেকেই কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। এ দিন সিইও–র বক্তব্যেও সেই সুর স্পষ্ট।
ঘটনাচক্রে এ দিন সিইও–র ভার্চুয়াল বৈঠকের কিছুক্ষণের মধ্যেই মনোজ এবং কমিশনের বিশেষ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্তকে নিশানা করে তীব্র আক্রমণ শাণায় তৃণমূল। কমিশনের অবজ়ার্ভারদের সরাসরি বিজেপির হয়ে কাজ করতে বলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রাজ্যের শাসকদলের। যদিও এই সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে কমিশন।
বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় ভোটের আগে। তার আগে আজ, রবিবার সিইও পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলে যাচ্ছেন ভোট প্রস্তুতি দেখতে। কাল, সোমবার থেকে টানা দু’দিন তিনি বায়ুসেনার হেলিকপ্টারে উত্তরবঙ্গের তিন জেলা মালদা, উত্তর দিনাজপুর, কোচবিহার এবং দক্ষিণবঙ্গে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় সফর করবেন। অতীতে রাজ্যের কোনও সিইও–কে ভোটের মুখে জেলা সফরে যেতে দেখা যায়নি।
এ দিন মনোজ ও সুব্রতর বিরুদ্ধে তৃণমূল অভিযোগ তোলে, তাঁরা নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা বারবার এই পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন ও নির্দেশ দিচ্ছেন, যা তাঁরা করতে পারেন না। তৃণমূলের দাবি, অবজ়ার্ভাররা সরাসরি রিপোর্ট দিল্লিতে পাঠাবেন। এই বৈঠক এবং নির্দেশ নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকেরা প্রতিবাদ করছেন। তার ফলে নানা বিপত্তি বাধছে। যদিও সিইও তৃণমূলের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। মনোজ বলেন, ‘অবজ়ার্ভাররা কমিশনের ডেপুটেশনে এসেছেন। তাঁদের খোঁজখবর নেওয়ার দায়িত্ব সুব্রতর। উনিও কমিশনের বিশেষ অবজ়ার্ভার, সারা রাজের দায়িত্বে রয়েছেন। আমরা অবজ়ার্ভারদের সঙ্গে কথা বলব না, তো অন্য কেউ বলবেন?’ বঙ্গ–বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের প্রতিক্রিয়া, ‘অতি দুর্বল চিত্রনাট্য। যাঁরা এ রকম বলছেন, তাঁদের অবিলম্বে মাথার চিকিৎসা করানো দরকার। পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই ওঁরা উন্মাদের মতো কথা বলছেন।’এর আগে এ দিন প্রথম দফায় ভোটমুখী ১৬ জেলার ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থানার ওসি, আইসি, রির্টানিং অফিসার, জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার, এসডিপিও–দের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন সিইও। বৈঠকে পর্যবেক্ষকরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিইও বলেন, ‘এখনও বহু জায়গায় চুক্তিভিত্তিক সরকারি কর্মীদের ভোটের কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। এখনই তাঁদের প্রত্যাহার করুন। নির্বাচন কমশনের নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ জেলার পুলিশকর্তাদের তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকটি জেলায় সিভিক ভলান্টিয়ারদের জলপাই রংয়ের পোশাক পরিয়ে ভোটের ডিউটিতে নিয়োগ করা হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর, বাঁকুড়া–সহ বেশ কয়েকটি জেলা থেকে নির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে। এখনই তাদের সরিয়ে না নিলে কমিশন শুধু সিভিক ভলান্টিয়ার নয়, সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে কমিশন।’
সিইও স্পষ্ট বলে দেন, ‘নির্বিঘ্নে ভোট করাই কমিশনের লক্ষ্য। কোনও অশান্তির ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গেই পদক্ষেপ করতে হবে। পদক্ষেপ করতে দেরি হলে কমিশন রেয়াত করবে না। কর্তব্যে গাফিলতির জন্য আপনাদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করা হবে।’ বৈঠকে তিনি জানতে চান, অতীতে ভোটের সময়ে অশান্তি নিয়ে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল তাদের কতজনকে এখনও গ্রেপ্তার করা হয়েছে? কেন এদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না?
এ দিনের বৈঠকে সিইও জেলাশাসক ও পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়ে দেন, ভোটের আগে এলাকায় মানুষের মধ্যে প্রচার চালাতে হবে— ভোটের সময়ে কোন কোন আচরণ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, কোন অপরাধে কী শাস্তি, কোনটা জামিন অযোগ্য ইত্যাদি। বিশদে মানুষের কাছে এই তথ্য পৌঁছে দিতে নির্বাচন কমিশন সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, রেডিয়োতে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। এই প্রচারের পাশাপাশি কমিশন এ বার বুথ নিরাপত্তা নিয়ে নিয়ে বিশেষ সতর্ক। তাই এ বারই প্রথম বুথের চারপাশে আক্ষরিক অর্থেই তৈরি করতে চলেছে ‘লক্ষ্মণগণ্ডি’।