• হাজারো অভিযোগ বক্তারের স্ত্রীর, তবু ‘দিদিকেই’ চান
    এই সময় | ১৯ এপ্রিল ২০২৬
  • সমীর মণ্ডল, ছোট আঙারিয়া

    এক সময়ে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতার ছোট আঙারিয়া। এই গ্রাম আজও বহন করে এক রক্তাক্ত স্মৃতি। এত বছর পরেও সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের জীবনে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। বরং বাসিন্দাদের মুখে বারবার উঠে আসে অভিযোগ। এখনও সুখে নেই বক্তারের পরিবার — এমনই দাবি তাঁর স্ত্রী আনিশা মণ্ডলের।

    বক্তার মণ্ডল আজ বেঁচে নেই। প্রায় চার বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী আনিশার গলায় এখনও শোনা যায় ক্ষোভ, অভিমান আর এক অদ্ভুত টানাপড়েনের গল্প। ভাঙাচোরা ঘরের সামনে বসে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভের কথা।

    ‘তৃণমূল করতে গিয়ে কত কষ্ট, কত অত্যাচার সহ্য করেছি,’ — বলছিলেন আনিশা। ‘আজ দল বড় হয়েছে, নেতা বেড়েছে। কিন্তু আমাদের আর দরকার নেই। কেউ আর খোঁজও নেয় না।’

    ছোট আঙারিয়া — এই নাম শুনলেই উঠে আসে ২০০১–এর ৪ জানুয়ারির সেই ভয়াবহ রাতের কথা। কনকনে শীতে একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে একদল দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে। সেই সময়ে সেখানে তৃণমূল কর্মীদের বৈঠক চলছিল। পালানোর চেষ্টা করলে গুলি, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে একাধিক কর্মীকে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় পড়ে যায়। অভিযোগ ওঠে সিপিএম নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, যদিও পরে আদালতে অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস পান। সেই ঘটনার অন্যতম সাক্ষী আনিশা। তাঁর কথায়, ‘সেই রাতের কথা মনে পড়লে এখনও বুক কেঁপে ওঠে।’

    গ্রামের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে শহিদ বেদি। তার পাশে উড়ছে তৃণমূলের পতাকা। দেওয়ালে লেখা ভোটের আবেদন। কিছুটা পাকা রাস্তা হয়েছে বটে, কিন্তু মাঝপথেই থেমে গিয়েছে। আনিশাদের বাড়ি পর্যন্ত আর পৌঁছয়নি। বর্ষায় হাঁটু জল জমে থাকে উঠোনে। নিকাশি ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।

    আজও বক্তারের পুড়ে যাওয়া বাড়িটা ভগ্নস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে। চারপাশে আগাছার জঙ্গল। আনিশার অভিযোগ, ‘আবাস যোজনায় বাড়িও পাইনি। কষ্ট করে যে ঘরটা বানাতে শুরু করেছিলাম, সেটাও শেষ করতে পারিনি।’

    অভাবের ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় তাঁর কথায়। বড় ছেলে আলুর হিমঘরে কাজ করেন। ছোট ছেলে দিনমজুর। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। ‘শহিদ পরিবারের কেউ একটা চাকরি পর্যন্ত পেল না,’ — আনিশার গলায় ফুটে ওঠে হতাশা। তবুও ক্ষোভের মধ্যেই দলের জন্য অদ্ভূত আবেগ কাজ করে তাঁর। বলেন, ‘দিদি ভালো। তাঁর কোনও দোষ নেই। আসলে স্থানীয় নেতারা নিজেদের জন্য সব করছেন। আমরা কিছু না পেলেও দিদির সঙ্গেই আছি।’ প্রতি বছর ৪ জানুয়ারি ‘ছোট আঙারিয়া দিবস’ পালন করে তৃণমূল। কিন্তু অভিযোগ, সেই অনুষ্ঠানে তাঁদের ডাকা হয় না। এই আক্ষেপও কম নয় আনিশার মনে।

    একই সুর শোনা গেল বক্তার মণ্ডলের ভাইয়ের স্ত্রী আসিয়া মণ্ডলের গলাতেও। তাঁর অভিযোগ, তাঁর স্বামী ওসমান মণ্ডলকেও সে দিন খুন করা হয়েছিল। তিনি বলেন ‘আমরা ভেবেছিলাম বিচার পাব। কিন্তু কেউ শাস্তি পেল না।’

    তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য অন্য কথা বলছে। দলের প্রাক্তন ব্লক সভাপতি সেবাব্রত ঘোষ বলেন, ‘ওই পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়। বাড়ি তৈরির টাকাও দেওয়া হয়েছিল। মানুষের চাহিদার শেষ নেই, তাই এমন অভিযোগ।’ বর্তমান ব্লক সভাপতি অসীম সিংহ রায় অবশ্য স্বীকার করেছেন, ‘কিছু ক্ষোভ রয়েছে পরিবারের। বিশেষ করে বক্তার মণ্ডলের ভাই ওসমান মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনার বিচার না হওয়া নিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ওঁদের সঙ্গে কথা বলব, সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করব।’

    অন্য দিকে, এত বছর বাদেও তাদের দলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিপিএম নেতা তপন ঘোষ। বলেন, ‘সবটাই সাজানো মিথ্যা অভিযোগ ছিল। আদালত আমাদের বেকসুর খালাস করেছে।’

    বক্তারহীন ছোট আঙারিয়ায় এখনও জোড়াফুলেরই রমরমা। অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে দেখা যায় না। গ্রামের মেঠো পথে আজও যেন অবিশ্বাসের পদচিহ্ন। সেখান থেকে রক্ত ধুয়ে গেলেও পড়ে রয়েছে বঞ্চনার অভিমান।

  • Link to this news (এই সময়)