২০১১-তে এই আসন তৃণমূল পেলেও পরের দু'টি বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয় আরএসপি ও বিজেপি। ২০২১-এ জয়ী হওয়া অশোককুমার লাহিড়ীকে এ বার টিকিট দেয়নি বিজেপি। পরিবর্তে আইনজীবী বিদ্যুৎকুমার রায়কে প্রার্থী করেছে তারা। গত ১০ বছর বিরোধীরা ক্ষমতায় থাকলেও বালুরঘাটের কোনও উন্নয়ন হয়নি বলে প্রচারে বলছেন তৃণমূল প্রার্থী অর্পিতা ঘোষ। অন্যদিকে আরএসপি প্রার্থী অর্ণব চৌধুরী বলছেন- বামফ্রন্ট এলে শিক্ষা, কর্মস্থান ও স্বাস্থ্য পুনর্গঠনে জোর দেওয়া হবে। বালুরঘাটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়ন। এ বারের নির্বাচনে প্রধান তিন প্রার্থীর মূল ইস্যুও তাই মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়ন। বিজেপি প্রার্থী বলছেন, রাজ্যে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকেও অন্য জেলার মতো বালুঘাটে মেডিক্যাল কলেজ করতে পারল না, তার জবাব দিক তৃণমূল কংগ্রেস। গত বার বিজেপির জয়ের মার্জিন ছিল ১৪ হাজারের মতো। অর্পিতা কি পারবেন এই ব্যবধান ঘুচিয়ে নাটকের শহরে 'সম্রাজ্ঞী' হতে?
জেলার মধ্যে তপন বিধানসভা সব থেকে বেশি খরাপ্রবণ। গরম পড়লেই মাটির নীচের জলস্তর অনেক নেমে যায়। জলের এই কষ্ট বাম আমল থেকেই চলছে। যার সমাধান এখনও হয়নি। এ বারও তাই তপন বিধানসভায় প্রধান ইস্যু পানীয় জল। ২০১১ ও ১৬-তে এই আসনে জয়লাভ করেন তৃণমূল প্রার্থী বাচ্চু হাঁসদা। ২০২১-এ তৃণমূলের খাস তালুক হিসেবে পরিচিত এই আসনে বিজেপি প্রার্থী বুধরাই টুডু জয়লাভ করেন। এ বারের ভোটে দাঁড়িয়ে তিনি বলছেন, বিরোধীদলের বিধায়ক হওয়ায় তৃণমূলের নেতাদের চাপে কাজ করতে দেয়নি প্রশাসন। অন্যদিকে তৃণমূল প্রার্থী চিন্তামণি বিহা প্রচারে বলছেন, বর্তমান বিধায়ক ডুমুরের ফুল। পাঁচ বছর তাঁকে দেখা যায়নি। তিনি জিতলে আর সেই সমস্যা থাকবে না। বাম প্রার্থী বাপ্পাই হরোর একটাই কথা, বামফ্রন্ট না এলে তপনের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর গঙ্গারামপুর। গঙ্গারামপুরেই বাস রাজ্যের বিদায়ী ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী বিপ্লব মিত্রের। মন্ত্রীর গড়ে বরাবরই পিছিয়ে তৃণমূল। ২০১১-তে তৃণমূল প্রার্থী সত্যেন্দ্রনাথ রায় জয়ী হন। পরে ২০১৬-য় এই আসনে কংগ্রেস প্রার্থী গৌতম দাস জয়লাভকরেন। যদিও জয়লাভের কিছুদিন পরে তিনি তৃণমূলে চলে যান। অন্যদিকে, তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক সত্যেন্দ্রনাথ বিজেপিতে যোগদান করেন। ২০২১-এর নির্বাচনে তিনি প্রায় সাড়ে চার হাজার ভোটে গৌতমকে হারিয়ে জয়ী হন। গঙ্গারামপুরে রয়েছে জেলার বড় বড় শিল্প কারখানা। তেলের মিল। চালের মিল, ইটভাটা ও পাট কারখানা। এ বারের নির্বাচনে সত্যেন্দ্রনাথ গত পাঁচ বছরের উন্নয়নের তালিকা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরছেন। প্রচারে তৃণমূলের দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে আনছেন সিপিএম প্রার্থী বিপ্লব বর্মন।
জেলার হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম বিপ্লব মিত্র, এই আসনে তৃণমূল প্রার্থী। বরাবরই জেলাবাসীর পাশাপাশি রাজ্যবাসীর নজর থাকে এই আসনে। ২০১১-তে প্রথমবার জয়লাভ করেছিলেন বিপ্লব। তবে ২০১৬-তে প্রায় সাড়ে চার হাজার ভোটে বামপ্রার্থীর রফিকুল ইসলামের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। ২০২১-এ এই আসন থেকে আবার প্রায় সাড়ে ২২ হাজার ভোটে জয়লাভ করে মন্ত্রী হন বিপ্লব। এই আসনে সংখ্যালঘু ভোট সবথেকে বড় ফ্যাক্টর। 'সার'-এর চূড়ান্ত তালিকায় ১৩৪৬০ জনের নাম 'ডিলিট' হওয়ায় চিন্তায় শাসকদল। এই আসনে কংগ্রেস প্রার্থী হয়েছেন এক সময়ের দাপুটে তৃণমূল নেতা শুভাশিস পাল। বিপ্লব মিত্রকে জেতানোর পিছনে তিনি একসময়ে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছিলেন। এবার তৃণমূলের দুর্নীতি তুলে ধরেই প্রচার চালাচ্ছেন। 'ডিলিট' ভোটারদের তুলনায় গত বারের ব্যবধান বেশি, এটা তৃণমূলের কাছে স্বস্তির কারণ।
২০১১-য় রাজ্যে যখন তৃণমূলের জয়জয়কার, সেই সময়ে এই আসনটি বামেদের দখলে ছিল। জয়ী হয়েছিলেন আরএসপি প্রার্থী নর্মদা রায়। তবে ২০১৬ ও ২০২১-এ দুটি নির্বাচনে এই আসন তৃণমূল দখল করে। এবার তৃণমূল প্রার্থী রেখা রায় জয়ের হ্যাটট্রিক করতে ময়দানে নেমেছেন। আরএসপি এ বার প্রয়াত বাম বিধায়ক নর্মদা রায়ের ছেলে জ্যোতির্ময়কে প্রার্থী করেছে। প্রচারে গত ১০ বছরে কী উন্নয়ন করেছেন, খতিয়ান তুলে ধরছেন রেখা। বিজেপি প্রার্থী তাপস রায় তৃণমূলের দুর্নীতির অবসানে তাঁকে ভোট দেওয়ার কথা বলছেন।
বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এই বিধানসভা ২০১১ থেকে এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের দখলে। ২০১৬ ও ২০২১-এর নির্বাচনে রেকর্ড ভোটে জয়লাভকরেন তোরাফ হোসেন মণ্ডল। এ বারও তিনি প্রার্থী। তাঁর দাবি, বামফ্রন্ট যে কাজ করেনি, গত ১০ বছরে সেই কাজ কুমারগঞ্জে করেছেন তিনি। বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকারের দাবি, জেলার মধ্যে কুমারগঞ্জে সব থেকে বেশি খারাপ রাস্তা। জিতলে সব পাকা করে দেবেন। এই আসনে সব থেকে বেশি সংখ্যালঘুদের বাস। 'সার'-এ অনেকের নাম বাদ পড়ায় চিন্তায় রয়েছে শাসকদল।
তথ্য সহায়তা: রূপক সরকার, শীতল চক্রবর্তী