প্রদীপ চক্রবর্তী, পাণ্ডুয়া
আলুচাষিদের অভাবী বিক্রি ঠেকাতে বাংলায় ৫০টি নতুন হিমঘর করা হবে। এরই পাশাপাশি, আগামী বিধানসভায় ৩০ হাজার কোটি টাকার আলাদা কৃষি বাজেটও তৈরি করা হবে। শনিবার পাণ্ডুয়ায় কোহিনূর রাইস মিলের মাঠে দলীয় প্রার্থী সমীর চক্রবর্তীর সমর্থনে জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এমনটাই দাবি করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আলুচাষিদের আশ্বস্ত করে অভিষেক বলেন, ‘আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। এ বছর আপনাদের উৎপাদন বেশি হয়েছে। তাই কিছু জায়গায় অভাবী বিক্রি হয়েছে। তাই সরকার কথা দিয়েছে, আগামী বিধানসভায় আলাদা করে কৃষি বাজেট ও নতুন হিমঘর তৈরি করা হবে।’
সেই সঙ্গে অভিষেকের সংযোজন, ‘এ বারে শীত বেশি থাকায় আলুর উৎপাদন ভালো হয়েছে। যেখানে এক বিঘেতে ৬০ থেকে ৬৫ বস্তা আলু চাষ হতো, সেখানে ১২৫ থেকে ১৩০ বস্তা আলু চাষ হয়েছে।’ তবে সারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে একহাত নিয়ে অভিষেক দাবি করেন, ‘২০২৪ সালে কৃষকরা এক বস্তা সার কিনতেন ১৪৫০ টাকায়। এখন ২০২৬ সালে তার দাম বেড়ে হয়েছে ১৮৮০ টাকা। সারের দাম রাজ্য সরকার ঠিক করে না, ঠিক করে কেন্দ্রীয় সরকার। নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে বলব, কৃষকদের জন্য কুম্ভীরাশ্রু না ফেলে, সারের দাম কমান।’ এখানেই থেমে না থেকে অভিষেক বলেন, ‘যে নাইলনের বস্তা ৮ টাকা ছিল, সেই বস্তা ২৪–২৫ টাকা করে দিয়েছে। সেটা বিক্রি করে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটের এজেন্সি। যাদের ডাবল ইঞ্জিন সরকার। তাই আমাদের প্রতিশ্রুতি, আগামী দিনে আলুর উৎপাদন বাড়লেও, কোনও কৃষককে অভাবী বিক্রি করতে হবে না।’ এই জোরালো দাবির পাশাপাশি অভিষেক এ–ও বলেন, ‘মমতার সরকার কৃষক বন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে ভূমিহীন কৃষকদের জন্য বছরে চার হাজার টাকার আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করেছে। অন্য দিকে, দিল্লির নরেন্দ্র মোদীর কৃষক বিরোধী সরকার কালো কৃষক আইন চালু করেছে। যার জন্য ৭০০ জন কৃষককে আত্মহত্যা করতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরে মোদী সরকারের বিরোধিতা ও আন্দোলন করতে গিয়ে ১০ হাজার ৩০০ জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। তাই তাদের কাছ থেকে কৃষকের উন্নয়ন আমাদের শিখতে হবে না।’
এ দিন পাণ্ডুয়ার সভামঞ্চ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আলুচাষিদের পাশে থাকার বার্তা দিতেই উচ্ছ্বসিত জেলার আলুচাষি থেকে আলু ব্যবসায়ী সংগঠন ও হিমঘরের মালিকরা। তাঁদের কথায়, ‘আলু একটি অর্থকরী ফসল। দেশ ও রাজ্যের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে আলুর একটা ভূমিকা থাকে। এ ছাড়া, আলু চাষ ও আলুর বাজারজাত ও বিক্রির মধ্য দিয়ে বহু মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জীবিকা জড়িয়ে আছে। যুগের পর যুগ ধরা চলা আলুর অভাবী বিক্রি বন্ধে সরকার যদি সচেষ্ট হয়ে সদর্থক পদক্ষেপ করে, তা হলে আলুচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কৃষকরা যেমন আলু চাষ করবেন, তেমনই আলুতে নতুন বিনিয়োগের রাস্তাও সুগম হবে।’ রাজ্যের প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী ও প্রোগ্রেসিভ আলু ব্যবসায়ী সংগঠন জানিয়েছে, এ বার রাজ্যে প্রায় এক কোটি ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছে। যেটা বিগত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। যেহেতু ফলন বেশি হয়েছে, তাই এ বার ৮০ লক্ষ মেট্রিক টন আলু হিমঘরে লোড হয়েছে, যেটা এখনও পর্যন্ত রেকর্ড। যদিও সরকার অভাবী বিক্রি ঠেকাতে ১২ লক্ষ মেট্রিক টন আলু কুইন্ট্যাল প্রতি ৯৫০ টাকা সহায়ক মূল্যে কিনেছে। প্রত্যেক আলুচাষি প্রায় ৭০ বস্তা করে আলু বিক্রি করার সুযোগ পেয়েছেন। অভিষেকের প্রতিশ্রুতিমতো বাংলায় নতুন ৫০টি হিমঘর তৈরি নিয়েও আশার আলো দেখছেন আলু ব্যবসায়ী ও হিমঘরের মালিকরা।
হিমঘর সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যে প্রায় ৫১৩টি ও হুগলিতে ১৪০টি হিমঘর আছে। তিন লক্ষ প্যাকেট আলু রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন হিমঘর তৈরি করতে প্রায় ১২ থেকে ১৩ কোটি টাকা খরচ হয়। রাজ্য প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক লালু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘অভিষেকের এই প্রতিশ্রুতি আলু শিল্পের জন্য দারুণ উপযোগী। আলুর সঙ্গে চেন সিস্টেমে অনেকের রুজি–রুটি জড়িয়ে আছে। এ বার হিমঘরে রেকর্ড পরিমাণ আলু লোড হয়েছে। মার্চ মাস থেকে লোড হওয়া আলু মে মাসের মাঝামাঝি থেকে বেরতে শুরু করে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে হিমঘর খালি হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই, সরকারের এই উদ্যোগে আলুর বাজার চাঙ্গা হবে।’ বিদায়ী কৃষি বিপণন দপ্তরের মন্ত্রী বেচারাম মান্না বলেন, ‘মানবিক মুখ্যমন্ত্রী সব কিছুতেই মানুষের পাশে থাকেন। টানা কয়েক বছর ধরে রাজ্য সরকার ধারাবাহিক ভাবে কৃষকদের থেকে সহায়ক মূল্যে আলু কিনছে। গত কয়েক বছর ধরে আলুর রেকর্ড ফলন হচ্ছে। সেটা সরকারের নজরে ছিল। ভোট ঘোষণার আগে থেকেই সরকার সহায়ক মূল্যে আলু কেনা শুরু করেছে। শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ না রেখে, আলুকে বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে বাজারজাত করায় উদ্যোগী হয়েছে মমতা সরকার। সুতরাং, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে কথা দিয়েছেন, তাতে আলু চাষ ও আলুর বাজার নিয়ে নতুন দিগন্ত রচিত হবে।’