• বার্ধক্য ভাতা ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারই বড় ভরসা ৭০-ঊর্ধ্ব হকার দেবু চক্রবর্তীর
    বর্তমান | ১৯ এপ্রিল ২০২৬
  • অরিজিৎ ঘোষাল, রানাঘাট: ওষুধ খরচ ও জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। দিশেহারা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি। তারমধ্যে অনেক সহায় সম্বলহীনদের এই মুহূর্তে বড় ভরসা রাজ্য সরকারের দেওয়া বার্ধক্য ভাতা ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। তারমধ্যে হকাররাও রয়েছেন। অনেকে পাড়ায় পাড়ায় আবার অনেকে বাসে ও ট্রেনে হকারি করেন। সেরকমই ট্রেনে হকারি করেন ৭০-ঊর্ধ্ব দেবব্রত চক্রবর্তী। বাড়ি শান্তিপুর রেলবাজার সংলগ্ন এলাকায়। তাঁর জীবন যুদ্ধের সাক্ষী শান্তিপুর শিয়ালদা লোকাল ট্রেনের যাত্রীরা। এক সময় ট্রেনে বই হকারি করতেন। এখন সময় বদলেছে। সবকিছু ডিজিটাল হচ্ছে। তাই এখন বইয়ের বদলে বিভিন্ন ভাজাভুজি ও মুখরোচক খাবার ফেরি করেন।

    বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রী ও নিজের শরীরের চিকিৎসা-সব মিলিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এই প্রবীণ হকারকে। বর্তমানে রাজ্য সরকারের ‘বার্ধক্য ভাতা’র হাজার টাকা এবং স্ত্রীর লক্ষীর ভাণ্ডারের ১৫০০ টাকা বড় ভরসা। ওষুধের খরচ দিন দিন বেড়েই  চলেছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। এই টাকাই তাঁদের দুর্দিনে বাঁচিয়ে রেখেছে।

    একসময় অনেক হকারের কাছে থাকত রকমারি গল্পের বই ও বাচ্চাদের বর্ণপরিচয়, ধারাপাত, সহ বিভিন্ন ধরনের বই। আজ সেই জায়গা নিয়েছে তেল মশলার খাবার, ভাজা পাঁপড়। দেবব্রতবাবুরা চার ভাই ও এক বোন। তাঁদের মধ্যে দেবব্রতবাবুই বাড়ির বড়। বর্তমানে দেবব্রতবাবু ও তাঁর বোন বেঁচে আছেন। বোন বিবাহিতা, থাকেন বেরিলিতে। বাকি দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। বাড়িতে থাকেন দেবব্রতবাবুর স্ত্রী পূর্ণিমাদেবী। তাঁরও বয়স ষাটের দোরগোড়ায়। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে শান্তিপুরের বাইরে। প্রায় ৩০ বছর ধরে দেবুবাবু ট্রেনে হকারি করছেন। আগে দু’বেলাই হকারি করতেন। এখন বার্ধক্য জনিত কারণ এবং ট্রেনে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর একবেলা হকারি করেন।

    একসময় ট্রেন যাত্রীদের কাছে দেবব্রতবাবু ছিলেন প্রিয় বই ফেরিওয়ালা। কিন্তু, বর্তমান ‘ডিজিটাল’ যুগে বইয়ের প্রতি মানুষের অনীহা আর স্মার্টফোনের প্রতি তীব্র আসক্তি এই পেশার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। দেবব্রতবাবুর কথায়, মানুষ এখন মোবাইল ফোনেই ব্যস্ত থাকে। বই কেনার লোক নেই। তাই পেটের জন্য বাধ্য হয়ে বইয়ের বদলে ভাজাভুজি ও পাঁপড় বিক্রি করি।

    তিনি বলেন, হকারি করতে গিয়ে হবিবপুরের কাছে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলাম। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বার্ধক্য জনিত সমস্যা। কিন্তু, শরীর চলুক না চলুক, পেটের টান বড় বালাই। তাই এখনো প্রতিদিন শান্তিপুর-শিয়ালদহ লাইনে ট্রেনে ফেরি করি। সন্ধ্যায় হকারি শেষ করে ফের ঘরে ফেরি।

    বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ও পায়ের যন্ত্রণা নিয়েই এখনো প্রতিদিন ট্রেনের কামরায় ঘুরে ঘুরে ফের করেন দেবুবাবু। শান্তিপুর লাইনে অনেক যাত্রীর কাছে তাঁর এই জীবন সংগ্রামের লড়াই হার না মানা অনুপ্রেরণার গল্প। 
  • Link to this news (বর্তমান)