• মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগই বাজি, গরম উপেক্ষা করে প্রচারে তৃণমূলের দুই ‘পর্ণা’,
    বর্তমান | ১৯ এপ্রিল ২০২৬
  • শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। বেলা বাড়তেই রাস্তায় যেন আগুন ঝরছে। এই তীব্র গরমও নির্বাচনি ময়দানে থামাতে পারেনি তৃণমূলের দুই তরুণ প্রার্থীকে। বনগাঁ দক্ষিণের ঋতুপর্ণা আঢ্য, আর বাগদায় মধুপর্ণা ঠাকুর। তৃণমূলের দুই ‘পর্ণা’ই গরমকে অগ্রাহ্য করে ঝড় তুলেছেন প্রচারে। সকাল থেকে রাত, মাঠে-ঘাটে, বাড়ি-বাড়ি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগেই বাজি ধরেছেন তাঁরা।

    বনগাঁ দক্ষিণে দিনের শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে ঋতুপর্ণাকে। কখনও পাড়ার খেলার মাঠে ব্যাট হাতে নেমে পড়ছেন, স্থানীয় ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে খেলতেই চলছে জনসংযোগ। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুডখোলা গাড়িতে চড়ে চষে বেড়াচ্ছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। হঠাৎ কোনো বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে সটান ঢুকে পড়ছেন। শিশুকে কোলে তুলে আদর, প্রবীণদের প্রণাম, বাকিদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতা। ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা স্পষ্ট ও আক্রমণাত্মক—‘একবার সুযোগ দিন, তৃণমূলকে জেতান। আগামী পাঁচ বছরে উন্নয়নের মাধ্যমে সেই আশীর্বাদ সুদে-আসলে শোধ করব।’ 

    সেই সঙ্গে সরাসরি বিজেপিকে নিশানা করে তাঁর দাবি, ‘যাদের নাম বাদ গিয়েছে, সেগুলি বিজেপি কেটেছে। তৃণমূল আবার নাম তুলে দেবে, এটাই গ্যারান্টি।’ এই বক্তব্যে যে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে, বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না কারও। অন্যদিকে, বাগদায় মধুপর্ণা ঠাকুরের প্রচার আরও গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে সামাজিক সমীকরণে। মতুয়া অধ্যুষিত এই বিধানসভায় ‘ঘরের মেয়ে’ হিসাবে নিজেকে তুলে ধরছেন তিনি। ঠাকুর পরিবারের সদস্যা হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের আবেগময় সংযোগ তৈরি হচ্ছে ভোটারদের সঙ্গে। তবে, শুধুই পারিবারিক পরিচয়ের উপর নির্ভর না করে মাটিতে নেমে সেই সম্পর্ককে আরও পোক্ত করার চেষ্টা করছেন মধুপর্ণা। তাঁর প্রচারের ধরনেও রয়েছে আলাদা মাত্রা। বড়ো মিছিল বা সভার পাশাপাশি তিনি হঠাৎই ঢুকে পড়ছেন সাধারণ মানুষের বাড়ির ভিতর। কখনও রান্নাঘরে বসে, কখনও উঠোনে পিঁড়ি পেতে শুনছেন মানুষের অভাব-অভিযোগ। কোথাও আবার মুহূর্তেই তাঁকে ঘিরে ধরছে মানুষ। কেউ সমস্যা জানাচ্ছেন, কেউ সেলফিতে বন্দি করতে চাইছেন ‘ঘরের মেয়ে’কে। এই ঘনিষ্ঠতাকেই তিনি ‘অস্ত্র’ করে তুলতে চাইছেন ভোটের লড়াইয়ে। রাজনৈতিক আক্রমণেও পিছিয়ে নেই মধুপর্ণা। তাঁর অভিযোগ, ‘এলাকার সাংসদ বিজেপির। সাত বছরে এই এলাকার জন্য কিছুই করেননি। এখন সাংসদের স্ত্রী এখানে প্রার্থী হয়েছেন। আমি দেড় বছরে যতটা পেরেছি উন্নয়ন করেছি।’ ভোটারদের কাছে তাঁর আবেদন, উন্নয়নের স্বার্থেই তৃণমূলের পাশে থাকুন। তবে এই দুই কেন্দ্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই লড়াইয়ে বাড়তি মাত্রা যোগ করছে। 

    বনগাঁ দক্ষিণ ও বাগদা—দু’টি বিধানসভাই একসময় বিজেপির দখলে ছিল। আর এই দুই কেন্দ্রেই ভোটারদের একটা বড়ো অংশ মতুয়া। ফলে নাগরিকত্ব, পরিচয় এবং ভোটার তালিকা—এই দুই কেন্দ্রে তিনটি ইস্যুই অত্যন্ত সংবেদনশীল। সাম্প্রতিক এসআইআরে মতুয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভ জমেছে বিস্তর। গ্রামেগঞ্জে সেই ক্ষোভ স্পষ্ট। 

    অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিয়েও তাঁরা আজ ‘বেনাগরিক’। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল প্রার্থীরা সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিক বার্তায় রূপ দিতে চাইছেন। বিজেপি সেই অভিযোগ অস্বীকার করে পালটা প্রচারে নেমেছে। বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি বিকাশ ঘোষ বলেন, ‘মানুষ ঠিক করে নিয়েছে বনগাঁ মহকুমার চারটি আসনেই বিজেপিকে জেতাবে। ওদের সব চেষ্টা বিফলে যাবে।’ এসআইআরে নাম বাদ যাওয়ার প্রসঙ্গে বিকাশবাবু জানিয়েছেন, ‘কারও নাম বাদ যাবে না।’
  • Link to this news (বর্তমান)