১৯৬২ থেকে ২০১৬। ৫৪ বছর। সুজাপুর ছিল কংগ্রেসের দখলে। বলা ভালো শাসন ছিল গনি খানের পরিবারের হাতে। বরকত গনি খান হয়ে ইশা খান চৌধুরী। পাঁচ দশকে বিভিন্ন সময় সুজাপুর কেন্দ্রে গনির কোতোয়ালি ভবনের সদস্যরাই প্রত্যেকটি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। জিতেছেনও। অটুট ছিল ‘গনির দুর্গ’।
এই দীর্ঘ সময়ে ‘উত্তরাধিকার সূত্রে’ বদলেছে নেতা। বদলেছে ভোটারদের প্রজন্মও। কিন্তু বারবার মানুষ ভরসা রেখেছে গনির পরিবারের উপর। দীর্ঘ সময়ে কাজ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু না পাওয়ার হিসেবটা দিনেকালে অনেক বড় হয়ে ওঠে। মানুষে মধ্যে জমা বাঁধে ক্ষোভ। ছিল আক্ষেপও! কেন গনি পরিবারের বাইরে কাউকে প্রার্থী করা হয় না? একুশের বিধানসভা নির্বাচনেই তা হয়ে ওঠে বড় ইস্যু। তার জেরে একুশের ভোটে প্রায় এক লক্ষ ছত্রিশ হাজারের ব্যবধানে তৃণমূল প্রার্থী হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি আবদুল গণির কাছে পরাজিত হন ইশা খান চৌধুরী। গনির গালিচায় প্রথমবার ফোটে ঘাসফুল।
সুজাপুর কেন্দ্র থেকেই প্রথমবার বিধায়ক হন আবু বরকত আতাউল গনি খান চৌধুরী। এলাকার মানুষের ভোটেই ‘দিল্লির মসনদ তক’ পৌঁছে গিয়েছিলেন বরকত গনি খান। হন রেলমন্ত্রীও। ২০০৬ সালে গনি প্রয়াত হন। কিন্তু ততদিনে সুজাপুরকে গনি পরিবারের ‘দুর্গ’ বানিয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণের পরেও সেই ‘দুর্গে’ কোনও ‘কামানের গোলা’ই দাগ কাটতে পারেনি। রুবি নূর, মৌসম নূর। তারপর গনির সুইজারল্যান্ড ফেরত ভাই আবু নাসের খান চৌধুরী (লেবু), তারপর গনির ভাই আবু হাসেম খান চৌধুরী ওরফে ডালুর ছেলে ইশা খান চৌধুরী। তাঁরাই বিভিন্ন সময়ে সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রের জনপ্রতিনিধি।
সুজাপুরের নির্বাচনী ইতিহাসে ঘাটলে দেখা যাবে, আবু বরকত আতাউল গনি খান চৌধুরী এই কেন্দ্র থেকেই ৫ বার বিধায়ক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর বোন রুবি নূর জিতেছেন ৪ বার। রুবির মেয়ে মৌসম বেনজির নূর জিতেছেন একবার। গনির ভাই আবু নাসের খান চৌধুরী জিতেছেন ২ বার। ডালুর ছেলে ঈশা খান চৌধুরী জিতেছেন একবার। যতবার গনি পরিবার এখানে জিতেছে ততবার এলাকার মানুষের না পাওয়া তালিকাও দীর্ঘ হয়েছে। বাস স্ট্যান্ড থেকে কলেজ। দমকল থেকে পুরসভা। বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা থেকে জল নিকাশি ব্যবস্থা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব। না পাওয়ার তালিকাটি দীর্ঘ।
৫৪ বছরের পর দিল্লির কংগ্রেস নেতারা বুঝেছেন আর না, গনি দুর্গের দেওয়াল আলগা হয়েছে। ছাব্বিশের নির্বাচনী (Bengal Election 2026) যুদ্ধে এবার কংগ্রেস প্রার্থী করেছে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী সমাজসেবক আবদুল হান্নানকে। তিনিই সুজাপুরের ৫৪ বছরের ইতিহাসে কোতোয়ালি ভবনের বাইরের প্রার্থী। অন্যদিকে তৃণমূলও তাঁদের প্রার্থী বদলেছে। মোথাবাড়ি থেকে তুলে এনে সাবিনা ইয়াসমিনকে দায়িত্ব দিয়েছে তারা। গনি গালিচায় ঘাসফুলের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে এই নির্বাচনের অনেক গুরুত্ব। টানা দু’বার তৃণমূল জিততে পারলে ‘গনি দুর্গে’ পুরোপুরি ফাটল ধরাতে পারবে শাসকদল। তবে কী বলছে সাধারণ মানুষ?
যদুপুরের এক রেশম ব্যবসায়ী খলিল শেখ বলেন, “গনির বাড়ির লোকরা পঞ্চাশ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু আমাদের রেশম চাষ ধ্বংস হয়ে গেলেও কেউ ঘুরে তাকাননি। আমরা এবার লোকাল লোককে এমএলএ করব।” কংগ্রেস কর্মী আসগার আলির কথায়, “আমরা লোকাল কাউকে প্রার্থী চাইতাম আগে থেকেই। এবার ভূমিপুত্র প্রার্থী পেয়েছি। তৃণমূলের প্রার্থী তো বহিরাগত। মোথাবাড়ি থেকে এসেছেন। ফলে ভূমিপুত্র এবার মানুষের সমর্থন পাবেন।”
গনি পরিবারের বাইরে কংগ্রেস প্রার্থী আবদুল হান্নান বিশেষ কিছু বলতে চাননি। তাঁর একটাই কথা, “কংগ্রেস আমাকে প্রার্থী করেছে। মানুষ আমাকে জেতাবেন।” কালিয়াচক ব্লক কংগ্রেস সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা দলের ১২টি অঞ্চল কমিটির থেকে এবার লিখিত রেজুলেশন পেয়েছিলাম। সব অঞ্চলের সভাপতিই বলেছিলেন, এবার কোতোয়ালি বাদ দিয়ে স্থানীয় কাউকে প্রার্থী করা হোক। দল সেটাই করেছে। এতে কংগ্রেসের আরও লাভ হবে।” জেলা কংগ্রেসের সভাপতি তথা সাংসদ ইশা খান চৌধুরী বলেছেন, “সুজাপুরের মানুষ যেটা চেয়েছিলেন সেটাই করা হয়েছে। আরও ভালো ফল হবে।”
‘অগ্নিপরীক্ষা’র সামনে তৃণমূলের সাবিনা ইয়াসমিন। মোথাবাড়ি থেকে তুলে এনে তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি এই এলাকারই বাসিন্দা। তবে তৃণমূল বলছে গনি পরিবারের বাইরে কাউকে প্রার্থী করায়, তারা ওয়াকওভার পেয়েছে। কালিয়াচক এক নম্বর ব্লকের তৃণমূল সভাপতি সারিউল শেখ বলেন, “যাকে কংগ্রেস প্রার্থী করেছে তিনি ৩ বছর ধরে জেলা পরিষদের সদস্য। কোনও কাজ করেননি।” তিনি আরও বলেন, “কংগ্রেসের প্রার্থী একজন ঠিকাদার, ব্যবসায়ী। কোটিপতি দেখে তাঁকে প্রার্থী করেছে কংগ্রেস। এতে তৃণমূলের আরও সুবিধা হয়েছে। আমরা ওয়াকওভার পেয়ে গিয়েছি। কোতোয়ালি বাড়ির কেউ থাকলে আমাদের লড়াই কঠিন হত। এবার তৃণমূলের প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিনও লোকাল। এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সাবিনা ইয়াসমিনকেই মানুষ এবার চাইছেন।”
কংগ্রেস জিতুক বা তৃণমূল। গনি পরিবারের কেউ নন, স্থানীয় চাহিদা মেনে বিধায়ক হবেন কোতোয়ালি ভবনের বাইরের কেউ। হিসাব করবে জনতা জনার্দন।