• যতই নাও রামের নাম, বিজেপি এ বার হারবে নন্দীগ্রাম: অভিষেক
    এই সময় | ২০ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: ২০২৪–এর লোকসভা ভোটের আগে রামমন্দিরের উদ্বোধন হলেও খাস অযোধ্যায় বিজেপির ভরাডুবি হয়েছে। বিজেপির রাম–রাজনীতি এ বার শুভেন্দু অধিকারীর খাসতালুক নন্দীগ্রামেও পরাজিত হতে চলেছে বলে দৃঢ় বিশ্বাসী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

    যে নন্দীগ্রামে গত বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু, জমি আন্দোলনের সেই পীঠস্থানে দাঁড়িয়েই অভিষেক রবিবার সেখানকার জোড়াফুল প্রার্থী পবিত্র কর–কে ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী করার টার্গেট ঘোষণা করেছেন। অভিষেকের কথায়, ‘নন্দীগ্রামে একদিকে পবিত্র, অন্যদিকে অপবিত্র। ২৫ হাজারের বেশি ভোটে পবিত্রকে জেতান। পূর্ব মেদিনীপুরের উন্নয়নের স্টিয়ারিং নন্দীগ্রামের হাতে থাকবে।’

    পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামকে নিজের গড় বলে দাবি করেন শুভেন্দু। সেই গড়ে ভোটের মাত্র চার দিন আগে জনসভা থেকে তৃণমূলের লোকসভার দলনেতার পর্যবেক্ষণ — জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে জনতা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, রাস্তার উন্নয়ন চায়, বিধায়কের কাছ থেকে মানুষ ধর্মের নামে রাজনীতি প্রত্যাশা করে না। নন্দীগ্রামের জনতাও এ বার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে উন্নয়নের মডেলকে সমর্থন করবেন বলে আশাবাদী অভিষেক। বলেন, ‘রামের নামে যাঁরা রাজনীতি করে, যেখানে রামমন্দির হয়েছে, সেই অযোধ্যা তাদের হারিয়েছে। তাই যতই নাও রামের নাম, বিজেপি হারবে এ বার নন্দীগ্রাম। কেউ বাঁচাবে না। মানুষ রাস্তা, জল, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী চায়।’

    উল্লেখ্য, ডায়মন্ড হারবারের মডেলে নন্দীগ্রামেও সেবাশ্রয় স্বাস্থ্য শিবির করেছিলেন অভিষেক। সেই স্বাস্থ্য শিবিরে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের চিকিৎসা হয়েছে। আর তাতে শুভেন্দুর একাধিপত্যে অনেকটাই চিড় ধরেছে বলে তৃণমূলের দাবি। যে ভাবে তিনি ডায়মন্ড হারবারকে আগলে রাখেন, উন্নয়নের কাজ করেন, নন্দীগ্রামে জোড়াফুল ফুটলে সেই ভাবেই নন্দীগ্রামকেও আগ‍লে রাখার আশ্বাস দিয়েছেন তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা। ২০২১–এর ভোটে শুভেন্দু নন্দীগ্রামে জয়ী হলেও বিধায়ক হিসেবে গত পাঁচ বছরে উন্নয়নের কাজ করার বদলে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার দিকেই বিরোধী দলনেতার ঝোঁক বেশি ছিল বলে অভিষেকের পর্যবেক্ষণ। শুভেন্দুকে ইঙ্গিত করে অভিষেক রবিবার বলেন, ‘ধর্ম নিয়ে যাঁরা রাজনীতি করে, তাঁরা দেউলিয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্ন, বস্ত্র হলো আমাদের পথ চলার প্রেরণা। আমি সমাজমাধ্যমে দেখি, মানুষ বলছেন ‘আমাদের রাস্তা ঠিক নেই। উনি (শুভেন্দু) বলছেন, ধর্ম রক্ষা করতে হবে।’ মানুষ নিজের ধর্ম রক্ষা করতে পারে না? ধর্মের নামে আপনাদের বিভ্রান্ত করছে (শুভেন্দু)। এর থেকে বড় ধাপ্পাবাজ ও বেইমান বাংলায় কেউ নেই।’

    নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়ে যাঁর বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন অভিষেক, সেই শুভেন্দু এ দিন সন্ধ্যায় কলকাতার ভবানীপুরে দাঁড়িয়ে তৃণমূলকে টার্গেট করে পাল্টা বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে আছেন, মানুষ বলছেন ৩৪ বছর বামেদের দেখেছি, ১৫ বছর চোরেদের দেখেছি, পাঁচ বছর রামেদের হাতে রাজ্য ছেড়ে দিতে চাই।’ শুভেন্দুর কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরি নামে শব্দ তুলে দিয়েছেন, টাটাকে তাড়িয়েছেন, মৌলবাদী ও রোহিঙ্গাদের আমদানি করেছেন। শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে পারেনি। তোলাবাজি কাটমানি চালু করেছে। এই সরকার ব্যর্থ সবাই জানেন।’

    আবার বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি’ করার অভিযোগ তুলেছেন অভিষেক। নন্দীগ্রামের জনসভায় তাঁর কথায়, ‘বিজেপি জিতলে বলবে, রামমন্দির করব, রামনবমী করব। আমি যখন ভোটে নির্বাচিত হই, তখন আমার একটাই ধর্ম, তা হলো মানব–ধর্ম। আপনি বাড়িতে, মন্দিরে পুজো করুন। মসজিদ, চার্চ, গুরুদ্বারে যান–– কারও আপত্তি নেই।’

    কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার। পূর্ব মেদিনীপুরে দু’জন বিজেপির সাংসদ। শুভেন্দু নিজে নন্দীগ্রামে বিজেপির বিধায়ক হিসেবে পাঁচ বছর রয়েছেন। কিন্তু মোদী সরকারের কোনও প্রকল্প কি তিনি নন্দীগ্রামের মানুষের জন্য আনতে পেরেছেন — এ দিন সেই প্রশ্নও তুলেছেন অভিষেক। নন্দীগ্রামের উন্নয়নের রিপোর্ট কার্ড নিয়ে শুভেন্দুর সঙ্গে মুখোমুখি বিতর্কে বসার চ্যালেঞ্জ–ও ছুড়ে দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। অভিষেকের কথায়, ‘পাঁচ বছর শুভেন্দু অধিকারী বিধায়ক। গত পাঁচ বছরে নন্দীগ্রামে নরেন্দ্র মোদী সরকার কী করেছে? ক’টা বাড়তি নতুন প্রকল্প উনি এনেছেন? শুভেন্দু অধিকারীকে অনুরোধ করব, মঞ্চ বেঁধে মানুষের সামনে তথ্য উপস্থাপিত করুন। আমি থাকব, আপনিও আসুন। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা তো মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতার থেকে বেশি। তা হলে গত পাঁচ বছরে প্রধানমন্ত্রী নন্দীগ্রামের জন্য কী করলেন?’

    সেই জায়গায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার নন্দীগ্রামে ১২ হাজার বাড়ি নির্মাণ করেছে, ৯৭ হাজার মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছেন, যুবসাথী পাচ্ছেন ২০ হাজার যুবক–যুবতী— পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন অভিষেক।

    নন্দীগ্রামে পবিত্রকে জয়ী করার টার্গেট নিলেও তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন এখানে নিরপেক্ষ নয়। বিশেষ করে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন অভিষেক। এনআইএ কিংবা সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সিও তৃণমূল নেতাদের টার্গেট করেছে বলে অভিষেকের বক্তব্য। তৃণমূলের লোকসভার দলনেতার অভিযোগ, ‘মনোজ আগরওয়াল গত ৭ তারিখ (এপ্রিল) নন্দীগ্রামে বিজেপির মার্কামারা গুন্ডাদের িনয়ে শুভেন্দু অধিকারীর হয়ে প্রচার করেছেন। আমি জানি না, শুভেন্দু অধিকারীর নির্বাচনী এজেন্ট কে? কিন্তু আমার মনে হয়, আপনার ইলেকশন এজেন্টের নাম মনোজ আগরওয়াল।’ এ নিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে ফোন করে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে পাঠানো বার্তারও জবাব মেলেনি।

    রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, গেরুয়া শিবিরের শক্তিশালী ভোট মেশিনারি রয়েছে নন্দীগ্রামে। জোড়াফুলকে জিততে গেলে এই মেশিনারির সঙ্গে টক্কর নিতে হবে। গেরুয়া মেশিনারির মোকাবিলা করতে তৃণমূল নেতা–কর্মীদের এ দিন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অভিষেক। স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘রাতের অন্ধকারে এখানে অনেক কিছু হয়। এলাকায় পাহারা দিতে হবে। ভোটের আগের দিন অনেক কিছু বিতরণ করা হয়।... এনআইএ কিংবা সিবিআই যাবে, মায়েরা বেরিয়ে আসবেন রাস্তায়। ২০০৭ নন্দীগ্রাম পথ দেখিয়েছিল, কী ভাবে প্রতিরোধ করতে হয়।’

  • Link to this news (এই সময়)