• ধারে-ভারে এগিয়ে শশী, স্থানীয় উন্নয়নই ‘বাজি’ তৃণমূল শিবিরের
    বর্তমান | ২০ এপ্রিল ২০২৬
  • অর্ক দে, কলকাতা: একদিকে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে সাধারণ বাড়ির এক গৃহবধূর ‘অসাধারণ’ হয়ে ওঠার চেষ্টা! মধ্য কলকাতার শ্যামপুকুর বিধানসভায় ভোটের লড়াই জমজমাট। একদিকে প্রয়াত অজিত পাঁজার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ শশী পাঁজা। তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির উত্তর কলকাতা মহিলা মোর্চার সভানেত্রী, রাজনীতিতে তুলনামূলক আনকোরা পূর্ণিমা চক্রবর্তী। জয়ের হাসি কে হাসবেন, সেই চর্চাই চলছে শ্যামপুকুরের অলিগলিতে। লড়াইয়ে রয়েছেন বামফ্রন্টের ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী ঝুমা দাসও। এক সময়ের কাউন্সিলার হলেও শ্যামপুকুরের ভোটযুদ্ধে তাঁর নাম প্রায় অনুচ্চারিত! মূল লড়াই দু’জনেরই, শশী বনাম পূর্ণিমা। 

    কলকাতা উত্তর লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে শ্যামপুকুর বিধানসভা আসনটি (কেন্দ্র নং ১৬৬)। ডিলিমিটেশনের পর শ্যামপুকুর বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়েছে কলকাতা পুরসভার ৭, ৮, ৯, ১০, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২৪ এবং ২৬ নম্বর ওয়ার্ড। কলকাতার বাগবাজার, শ্যামবাজার এবং শোভাবাজারের মতো ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ এলাকাগুলি এই কেন্দ্রের মধ্যেই পড়ে। এক সময় এই অঞ্চল ফরওয়ার্ড ব্লকের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম দুর্গ হিসাবে পরিচিত। ২০১১ সাল থেকেই কেন্দ্রটি তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। ডাঃ শশী পাঁজা ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এখান থেকে জয়ী হন। গত বিধানসভা নির্বাচনে শশীদেবী ২২,৫২০ ভোটে বিজেপি প্রার্থী সন্দীপন বিশ্বাসকে পরাজিত করেছিলেন। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে বিজেপি ‘লিড’ পেয়েছিল। দেড় হাজারের কিছু বেশি ভোটে এগিয়ে ছিল গেরুয়া শিবির। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রটি তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির ‘হাই ভোল্টেজ’ লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এহেন শ্যামপুকুর কেন্দ্রে এসআইআরে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দিয়েছে। একাধিক অঞ্চলে অবাঙালি মানুষজনের আধিক্য থাকায় গেরুয়া শিবির এই বিধানসভা নিয়ে বিশেষ আশাবাদী। তবে সম্প্রতি ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভার দিন শশী পাঁজার বাড়িতে হামলার ঘটনার পর বিজেপি এখানে কিছুটা হলেও ব্যাকফুটে বলে মত স্থানীয় নাগরিকদের একাংশের। অজিত পাঁজার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বয়ে চলা বাড়িই ‘আক্রান্ত’ হওয়ার ঘটনাকে ভালো চোখে দেখছেন না স্থানীয়রা। গিরিশ পার্ক অঞ্চলের এক দোকানদারের কথায়, ‘এরা ক্ষমতায় আসার আগেই যে রূপ দেখাচ্ছে, ক্ষমতায় আসার পর কী না কী করবে!’ শশীদেবীকে এগিয়ে রেখেছে তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজও। মন্ত্রিত্ব সামলানোর পাশাপাশি চিকিৎসক হিসাবে প্র্যাকটিসও জারি রেখেছেন। সেই সঙ্গে এলাকায় রয়েছে নিয়মিত জনসংযোগ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, পুজো থেকে শুরু করে নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁকে ডাকলেই পাওয়া যায়। তাছাড়া, গত ক’বছরে অঞ্চলের চেহারাও পালটেছে শশীর হাত ধরেই। এবারও প্রার্থী হয়ে তিনি ছুটছেন পাড়ায় পাড়ায়, ক্লান্তিহীন। বর্ণাঢ্য মিছিলের আড়ম্বর সরিয়ে পায়ে হেঁটেই ঘুরছেন সর্বত্র। তিনি বলেন, ‘আমরা সারা বছর মানুষের সঙ্গে থাকি। এবার এসআইআরের জন্য মানুষের হয়রানিতেও পাশে থেকেছি। মানুষ উন্নয়নেই আস্থা রাখবে।’

    শশীর এই ‘ইমেজ’ ভাঙতে ছুটছেন বিজেপির পূর্ণিমাও। রাস্তা থেকে কানাগলি—কোনো ওয়ার্ড বা এলাকা বাকি রাখছেন না। পূর্ণিমা চক্রবর্তীর কথায়, ‘অঞ্চলে কোনো কাজ হয়নি। রাস্তাঘাট খারাপ। পানীয় জল ঠিকমতো পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র সিন্ডিকেট হয়েছে। বেআইনি নির্মাণ হয়েছে। অবৈধ পার্কিংয়ের রমরমা। এলাকার বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে ফুটপাতবাসীরা পড়ে থাকেন, সেটা দৃশ্যদূষণ ঘটাচ্ছে। ওঁদের জন্য শেল্টার তৈরি করা হবে।’ পাঁজা হাউজে ‘হামলা’ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ওঁর লোকেরাই বিজেপি কর্মীদের মারধর করেছিল। বিজেপি কর্মীদের মিথ্যা কেসে ফাঁসানো হয়েছে। এলাকার মানুষ জবাব দেবে।’ বাম প্রার্থী ঝুমা দাস বলেন, ‘বামফ্রন্ট আমালে কুমোরটুলিতে বড় প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছিল। গোটা এলাকার ভোল বদলে যেতে পারত। কিন্তু গত ১৫ বছরে কোনো কাজই হয়নি। কুমোরটুলির কী অবস্থা সবাই জানে। এছাড়া বেআইনি পার্কিং থেকে শুরু করে অবৈধ নির্মাণ বড়ো সমস্যা এই অঞ্চলে।’ 
  • Link to this news (বর্তমান)