ধারাবাহিক উন্নয়নেই জোড়াফুলের উপর ভরসা বেড়েছে আমজনতার
বর্তমান | ২০ এপ্রিল ২০২৬
শ্যামলেন্দু গোস্বামী, অশোকনগর: অশোকনগরকে জানতে হলে সকালেই বেরতে হয়। স্টেশনে ট্রেন থামে, ভিড় নামে, চায়ের ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠে— শহরের গতি এখানেই। প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে একটু এগলেই দৃশ্য পালটায়। গুমা, বাঁশপুল, শ্রীকৃষ্ণপুরে তখন মাঠে নামছেন কৃষকরা। অর্ধেক শহর, অর্ধেক গ্রাম নিয়েই অশোকনগর। এই জনপদের ভিতরে রয়েছে আরেক ইতিহাস— উদ্বাস্তুদের বসতি। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষের হাতেই গড়া এই শহর। তারও আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ বাহিনীর যুদ্ধবিমান ওঠানামা করত এখানে। সেই স্মৃতি এখন মিশে গিয়েছে রোজকার জীবনে। তার সঙ্গে জুড়ে আছে সাহিত্য চর্চা— পাড়ায় পাড়ায় নাটক, উৎসব, মঞ্চ। অশোকনগর তাই শুধু ভৌগোলিক নয়, এক সাংস্কৃতিক পরিসর। এই আবহের মধ্যেই সামনে আসে ভোট। ভোট মানেই উন্নয়ন। আর এই উন্নয়নকে বাজি করেই বিরোধীদের টেক্কা দিতে চাইছেন তৃণমূল প্রার্থী নারায়ণ গোস্বামী। এখানে বিজেপি প্রার্থী সুময় হীরা ও বাম সমর্থিত আইএসএফ প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়।
অশোকনগর শহরের বিল্ডিং মোড়ে চায়ের দোকানে দাঁড়াতেই শোনা গেল মানুষের কথাবার্তা। এবারের ভোটে কী হবে, তা নিয়েই চর্চা বিভিন্ন জায়গায়। কমিশনের অতিসক্রিয়তা নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে বলে আড্ডায় স্পষ্ট হল। তবে, সজল পুরকাইত নামের এক ব্যক্তি বলছিলেন, পানীয় জল এখন ঠিকঠাক। ওয়াটার এটিএম হয়েছে। রাস্তাও হয়েছে, এখন কাদা নেই। বাক্যগুলি ছোটো হলেও এর তাৎপর্য রয়েছে। পরিষেবার উন্নয়নকেই জানান দিচ্ছে ওই কথা। শেষে তাঁর সংযোজন, উন্নয়নই ভোটে শেষ কথা, ধর্ম নয়!
গুমায় গিয়ে সেই ছবিটা আরও খোলসা হয়। ধানখেতের পাশ দিয়ে কংক্রিট রাস্তা বাজারে মিশেছে। মনি গাজি নামের এক কৃষক গাছের ছায়ায় বসেছিলেন। কথা বলতে বলতে জানা গেল, তিনি উন্নয়নের পক্ষেই থাকবেন। তাঁর যুক্তি, এলাকায় পাকা রাস্তা হয়েছে। ফসল নিয়ে যেতে সুবিধা হয়। আর আলো বা পানীয় জলও আছে পর্যাপ্ত। ভুরকুণ্ডা পঞ্চায়েতের হিজলিয়া খালের উপর কংক্রিটের ব্রিজ হয়েছে। ‘আগে ঘুরে যেতে হতো, এখন সোজা যাওয়া যায়’, বললেন মাঝবয়সি গৃহবধূ প্রতিমা সরেন। অশোকনগর পুরসভার ১৫ থেকে ২২ নম্বর ওয়ার্ডে আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনেজ, সঙ্গে ১৬টি বুস্টার পাম্প— পানীয় জল ও নিকাশির সমস্যায় কিছুটা স্বস্তি হয়েছে বলেই জানালেন শহরের বাসিন্দা গুপি মজুমদার। এরপর স্বাস্থ্য। অশোকনগর হাসপাতাল নিয়েও ভরসার সুর শোনা গেল তাঁর কথায়। বললেন, স্টেডিয়াম নতুন করে সাজানো, উৎসব-কার্নিভাল, সংস্কৃতির চর্চাও দৃশ্যমান।
তৃণমূলের প্রার্থী নারায়ণ গোস্বামী। সাদা পাঞ্জাবি, সহজ হাসি— চেনা মুখ। ডাকলে পাওয়া যায়, সদর্পে জানালেন পেশায় শিক্ষক আশিস কুণ্ডু। তবে, নারায়ণকে নিয়ে গ্রাম বা শহরে উঠে এল বিভিন্ন কথা। কেউ বললেন, উনি নাটক করেন, চণ্ডীপাঠও করেন। কখনও গানও করেন। রাজনীতির বাইরেও তাঁর পরিচয় রয়েছে। তবে গ্রামে আড্ডা জমলে অন্য সুর। ১০০ দিনের কাজ বন্ধ— এই নিয়ে ক্ষোভ স্পষ্ট। বেড়াবাড়ির বাসিন্দা বিশ্বনাথ দাস বলেন, বিজেপি আমাদের ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করেছে। ওটাই ভরসা ছিল। বিজেপি এবার ভোট চাইতে এলে জবাব চাইব। মহিলাদের ভরসা— লক্ষ্মীর ভাণ্ডার।
মালিকবেড়িয়ার টুম্পা দে’র কথায়, সারাজীবন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার মমতার গ্যারান্টি। তবে রাজনৈতিক মাঠে নীরবতা। বিরোধীদের বড়ো কর্মসূচি চোখে পড়ে না। দেওয়াল লিখন কম, বাড়ি বাড়ি প্রচারও সীমিত। ফলে যে লড়াই দৃশ্যমান, তা একপাক্ষিক বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। এনিয়ে নারায়ণবাবু বলেন, আমি মানুষের জন্য কাজ করি। উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের টাকা এই এলাকায় নিয়ে আসি। তাছাড়া ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজ আমি করে চলেছি। তবে, বিজেপি নেতা তাপস মিত্র বলছেন, আসলে ভয়ে এই সব কথা বলছে তৃণমূল। মানুষ ওদের বাংলা থেকে বিদায় দেবে। ওদের নিজেদের দ্বন্দ্বই ওদের কাল করবে।