অমিত চক্রবর্তী
বাংলার ভোটার তালিকায় 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (সার)–এ যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিলমোহর দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল। গত সোমবার, ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া ওই প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনাল কিছু নামে ছাড়পত্র দিয়েছে। কিন্তু একটি নামও চূড়ান্ত ভাবে বাদ যায়নি। কারণ, জুডিশিয়াল অফিসারদের বিচারে বাদ যাওয়া ভোটারদের বক্তব্য জানার সুযোগ পায়নি ট্রাইব্যুনাল।
অথচ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কারও নাম বাদ দেওয়ার আগে তাঁকে বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া মাস্ট। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ভোটারকে সমন পাঠিয়ে তলব করাও বাধ্যতামূলক। সূত্রের খবর, সমন পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিকাল সাপোর্ট এখনও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তরফে দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে জুডিশিয়াল অফিসারদের হিসেবে বাদ যাওয়া প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের কত জন এ বার ভোট দিতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় থাকছেই।
শীর্ষ কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, এ বার ভোটের আগে নাম তোলার জন্য ট্রাইব্যুনালে দ্রুত শুনানির আবেদন জানাতে পারবেন নাগরিকরা। অথচ দক্ষিণ ২৪ পরগনার পৈলানে ট্রাইব্যুনালের অফিসটিকে নিরাপত্তার বেষ্টনীতে কার্যত দুর্গ করে তুলেছে ইসি। সেখানে মাছি গলার সুযোগ নেই, আবেদনকারী পৌঁছবেন কী ভাবে! এ ব্যাপারে আজ, সোমবার সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। একদিকে কারও নাম চূড়ান্ত ভাবে কাটার জন্য তাঁকে সমন পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে না ট্রাইব্যুনাল, অন্যদিকে আবেদনের দ্রুত শুনানির জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের কার্যত নাগাল পাচ্ছেন না নাগরিকরা। সুপ্রিম কোর্টে মামলার অন্যতম আইনজীবী অরিন্দম দাস জানান, গত শুক্রবার ট্রাইব্যুনালের অফিসে গিয়ে তাঁদের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, সে কথা জানিয়ে বিধান চাওয়া হবে আদালতের কাছে।
সুপ্রিম–নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে তৈরি ট্রাইব্যুনালে কাজের পরিকাঠামো ও পরিবেশ নিয়ে চরম হতাশ বিচারবিভাগের একাংশ। বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণও করেছেন তাঁরা। বাংলার ২৩টি জেলার ২৭ লক্ষ ডিলিটেড ভোটারের নাম চূড়ান্ত বিবেচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ১৯ জন রিটায়ার্ড জাস্টিসকে। ফলে একাধিক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির উপরে একাধিক জেলার দায়িত্ব পড়েছে। এক মাস আগে, গত ২০ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরে ১৩ এপ্রিল কাজ শুরু করলেও সদস্যদের কে কোন জেলার নথি বিবেচনা করবেন, বা একাধিক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি একটি জেলার দায়িত্বে থাকলে, কে কোন অংশটা দেখবেন, বহু ক্ষেত্রে সেটাও এঁদের অজানা।
জুডিশিয়াল অফিসাররা ডকুমেন্টস নিষ্পত্তির পরে 'প্রয়োজনীয় নথি না পাওয়ায় নাম বাদ দেওয়া হলো' গোছের বক্তব্য একলাইনে লিখেছেন। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা এতে আপত্তি জানান। তাঁদের যুক্তি, চূড়ান্ত ভাবে নাম বাদ দেওয়ার আগে আবেদনকারীর সঙ্গে কথা বলে সেই বক্তব্যই 'কারণ' হিসেবে লেখা হোক। এ জন্য কমিশন দু'হাজার ক্যারেকটার বরাদ্দ করেছে ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইংরেজিতে রায় লিখলে ৩০০–৩১৫ শব্দ ব্যবহার করা যাবে। ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ দেওয়ার 'কারণ' লেখার ক্ষেত্রে শব্দ বেঁধে দেওয়া কতটা ইতিবাচক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফলে, সব মিলিয়ে চূড়ান্ত অব্যবস্থা, নানা বিধি–নিয়মের মধ্যে থেকে কাজ করতে হচ্ছে ট্রাইব্যুনালকে। যে কারণে বিচারবিভাগের অফিসারদের একাংশেরই প্রশ্ন — ভোটের আগে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকাল সাপোর্ট জুগিয়ে ট্রাইব্যুনালকে দ্রুত কাজ এগনোর সুযোগ কি আদৌ দিতে পারবে কমিশন? যদিও ইসির একটি সূত্রের দাবি, সংশয়ের কারণ নেই। দ্রুত সব ব্যবস্থা হবে।